রাজনীতিহীন রাজনৈতিক দল

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

রাশেদ খান মেনন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। কয়েক বছর আগেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় ছিলেন। তখন তাঁর মুখ থেকে উচিত কথা শোনা যেত না বেশি। এখন আবার তা শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নানা অনিয়মের সমালোচনা করেছেন তিনি। বলেছেন, নির্বাচন এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে, এভাবে চললে রাজনৈতিক দলও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে।

মেননের এ আশঙ্কা ভয়াবহ হলেও অমূলক নয়। তিনি নির্বাচনের অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বলেছেন। এটি যে এ দেশে কতটা সত্য হয়ে উঠেছে, তা আমরা জনগণের নির্বাচন বর্জনের চিত্র দেখলে বুঝতে পারি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের সীমিতভাবে হলেও প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হয়। তারপরও খুব কমসংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেছে। নির্বাচন কমিশন এটা ২৭ শতাংশ বললেও বিরোধী দলগুলো বলছে, ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ১০ শতাংশের কম। আর আগের কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচনে অবস্থা ছিল আরও করুণ।

মানুষ ভোটকেন্দ্রে কেন যায়নি? এর উত্তর রয়েছে ভোটকেন্দ্রে কেন যায়, এ উত্তরের মধ্যে। মানুষের ভোটের জোয়ার আমরা শেষ দেখেছিলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে। তখন মানুষের আস্থা ছিল যে কে নির্বাচিত হবে, এটা ঠিক হবে তাঁদের ভোটে। বিশ্বাস ছিল যে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন, সেই ভোট ঠিকমতো গণনা করা হবে এবং সে অনুসারে ফলাফল নির্ধারিত হবে। এ বিশ্বাসে প্রথম বড় ধরনের ফাটল আসে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে। এরপর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে যেসব অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে, তাতে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে নির্বাচন মানে আর জনগণের ভোটাধিকার নয় এ দেশে। এ নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর হামলা আর মামলা করে ভীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য ও সরকারি দলের ক্যাডাররা এসবের সঙ্গে জড়িত থাকলেও সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। অনেক কেন্দ্রে ৩০ ডিসেম্বর দিনের ভোট হয় আগের রাতে।

এ নির্বাচনে জনগণকেও করে ফেলা হয় প্রতিপক্ষ। সাধারণ জনগণের প্রতি ক্ষমতাসীনদের বার্তা ছিল মোটামুটি এ রকম: ক) তুমি ভোট দিতে যেয়ো না, খ) ভোটকেন্দ্রে গেলে মার খেতে হবে, গ) ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকলে আমাদের নির্দেশিত প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে বা তাঁর পক্ষে ইতিমধ্যে ভোট দেওয়া হয়ে গেছে—এটি মেনে নিতে হবে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেশের কোটি কোটি মানুষকে এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, কতটা অনাহূত তারা নির্বাচনে।

জনগণ তাই এরপর ভোট বর্জন করেই এর উত্তর দিয়েছে। ভোটারবিহীন নির্বাচন এখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কতিপয় ব্যক্তির কাছে। এই কতিপয় ব্যক্তি যাঁকে মনোনয়ন দেন, তাঁকে নির্বাচিত করতে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা নিয়োজিত করা হয়। নির্বাচনটা হয়ে গেছে এই কতিপয় ব্যক্তির মনোনয়নে সীমাবদ্ধ, মানুষের ভোটে অবারিত নয়।

নির্বাচন তাই আসলেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে দেশে। নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক দলও, এমনকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলও। কারণ, কতিপয় ব্যক্তি যাঁকে মনোনয়ন দেন, তাঁকে বিজয়ী করে আনার জন্য রাজনীতির প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শক্তি প্রয়োগের। সরকারি রাজনৈতিক দল তখন আর জনমতের ধারক থাকে না, হয়ে পড়ে এই শক্তির বাহক।

নির্বাচনের পরেও ঘটে বিপত্তি। সংসদে তখন রাজনৈতিক দল থাকে না, থাকে কিছু কায়েমি গোষ্ঠী।

২. নির্বাচন অপ্রাসঙ্গিক হলে অনেকাংশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে রাজনৈতিক দল। কিন্তু মেনন যেটা বলেননি, সেটা হচ্ছে শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, রাজনৈতিক দল অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে বিভিন্ন দমন-নিপীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যমেও। এ দেশে এখন এটাই হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই নিপীড়ন নজিরবিহীন পর্যায়ে চলে গেছে নব্বই-পরবর্তী সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। না হলে অতীতে আমরা কবে দেখেছি কোনো সভা-সমাবেশ নাকচ করার বা তাতে কঠিন শর্তারোপ করার এমন পুলিশি দাপট? কবে দেখেছি বাম, ডান, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক যেকোনো মিটিং-মিছিলে পুলিশের এমন নির্যাতনের চিত্র? লাখ লাখ রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে এত ঢালাও মামলা? গণমাধ্যম, রাজপথে, সমাবেশস্থলে সরকারের স্তুতি গাওয়ার জন্য সরকারি দলের এমন একচ্ছত্র দাপট?

এসবের প্রভাব আমরা দেখি রাজনীতিতে। এ দেশে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, শ্রমিক পান না বেতন, শেয়ার মার্কেট-ব্যাংক লুট হলে জনদুর্ভোগ চরমে ওঠে, ভারতের এনআরসি বা সীমান্ত হত্যা নিয়ে মানুষজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে—সরকারি দল এসব নিয়ে মাঠে নামে না। নির্যাতন-নিপীড়নে স্তব্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এসব নিয়ে তেমন উদ্যম চোখে পড়ে না আর।

রাজনীতি শক্তিহীন ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতার কারণেও। তাদের অনৈক্য, নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং অদূরদর্শিতা কিছু ক্ষেত্রে চলে গেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে। একটা উদাহরণ দিই: সভা-সমাবেশে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে সামরিক আমলের মতো বিরোধী দলের রাজনীতি বর্তমানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ঘরোয়া রাজনীতিতে। অতীতে এমন ইস্যুতে আমরা সব (আবার বলছি সব) বিরোধী দলকে একত্রিত হয়ে আন্দোলন করতে দেখেছি। অতীতে মাগুরার একটিমাত্র আসনে কারচুপির পর বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, বাম দল—সবাইকে একসঙ্গে সোচ্চার হতে দেখেছি। বর্তমানে নিপীড়ন, ভোট কারচুপি, দেশের সম্পদ লুটের মতো সর্বজনীন ইস্যুতে এক মঞ্চ গড়তে পারে না, এমনকি শুধু বাম দলগুলোও। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের অবিরাম নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় কমপক্ষে চারটি ভিন্ন মঞ্চে বিভক্ত থেকে।

গত পাঁচ বছরে এ দেশে তিনটি বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছে—ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। এর একটিও রাজনৈতিক দলগুলো বা তাদের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়নি। এসব আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলো অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু শেষোক্ত দুটো আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করার পর বিরোধী দলগুলো না পেরেছে একা এর কার্যকর প্রতিবাদ করতে, না পেরেছে এটি করতে একতাবদ্ধ হতে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অপ্রাসঙ্গিকতার একটি বড় প্রমাণ আমরা পাই ডাকসু নির্বাচনে। এ নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়ম ও কারচুপির পরও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের প্রার্থীরা ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে জয়লাভ করে, বাকি সব আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পায়। সব বিরোধী ছাত্রসংগঠনের সম্মিলিত ভোট ছিল তাদের চেয়ে কম। অনেকে বিশ্বাস করে, কারচুপি না হলে ছাত্রলীগের ভোট হতো আরও কম।

৩. আমরা রাজনৈতিক দলের যত সমালোচনা করি না কেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের কোনো বিকল্প নেই। প্রায় আড়াই শ বছর আগে রাজনৈতিক দলের জন্মের পর তাদের মাধ্যমেই মানবাধিকার, গণতন্ত্র আর সুশাসনের ধারণা বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি অর্জনে রাজনৈতিক দলই ছিল মুখ্য ভূমিকায়।

রাজনৈতিক দল অপ্রাসঙ্গিক হলে রাষ্ট্রে শক্তিশালী হয়ে ওঠে নানা বাহিনী, সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ চক্র, অন্য রাষ্ট্রের চরসহ নানা অরাজনৈতিক শক্তি। জনগণের প্রতি এদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। ফলে এদের সব কার্যক্রম আর সিদ্ধান্তের লক্ষ্য থাকে কোটারি স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ নয়। সম্পদ আর সুযোগ কুক্ষিগত করে রাখার জন্য এরা বরং জনগণকে শোষণ আর অত্যাচার করে, তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং তাদের বিভ্রান্ত করে রাখে।

রাজনৈতিক দল ছাড়াও মানুষ কখনো কখনো প্রতিবাদ করতে পারে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আমরা তা দেখেছি। কিন্তু ক্ষণিকের আবেগ বা অসংগঠিত সমর্থনের ভিত্তিতে এসব আন্দোলন বেশি দূর যেতে পারে না। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন, আইকনিক নেতৃত্ব, আন্দোলনের ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক দলের থাকে।

রাজনীতি আর রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই অবশ্যই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে হবে। ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ, আবেগনির্ভর অনৈক্য ও ভীতিজনিত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ দেখানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তাদেরই।

আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

Print