নড়বড়ে বাসগুলোর শহরময় দাপাদাপি

August 10, 2018 at 12:09 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

  • রাস্তায় চলছে লক্কড়ঝক্কড় বাস
  • পুলিশের চোখের সামনেই চলছে
  • আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা
  • বিআরটিএর সক্ষমতার অভাব

গাবতলীর পর্বত সিনেমা হলের সামনে যেখানে ট্রাফিক পুলিশের অবস্থান, সেখান থেকেই সদরঘাটের পথে চলে ব্রাদার্স পরিবহন। ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু হওয়ার পর ওই স্থানে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতাও ব্যাপক। অথচ সেখানেই হালনাগাদ কাগজপত্র ছাড়া চলছে ব্রাদার্স পরিবহনের ঢাকা মেট্রো ব-১১-৪০৯২ নম্বরের একটি মিনিবাস।

হেডলাইট দূরে থাক, সামনে কোনো লাইটই নেই। ডানে-বায়ে মোড় নেওয়ার জন্য যে সংকেত বাতি, তা-ও নেই। বাসের সারা গায়েই আঁচড়, রংচটা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে পর্বত সিনেমা হলের সামনে যাত্রীর জন্য হাঁকডাক দিচ্ছিল এই বাসের চালকের সহকারী।

এরপর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, এই বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১২ সালের জুলাই মাসে। সরকারি ট্যাক্সও ২০১২ সাল পর্যন্ত বকেয়া। চলাচলের কোনো অনুমোদন (রুট পারমিট) নেই।

শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বেপরোয়া বাসচালকের চাপা দেওয়া এবং এরপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজধানীর গণপরিবহনের আসল চরিত্র বেরিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনব্যবস্থায় গলদ থাকায় পুলিশের ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা ও মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো থেকে শৃঙ্খলা আনার একগুচ্ছ আশ্বাসের পরও লক্কড়ঝক্কড় যান চলাচল করছে। আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিআরটিএর দুর্নীতি ও সক্ষমতার অভাব এবং ব্যবস্থার গলদ বন্ধ না হলে নৈরাজ্য বা বিশৃঙ্খলা বদলাবে না।

পরিবহন খাতে গত কয়েক দিনের নানা ঘটনাপ্রবাহের কারণে বাস-মিনিবাসের চলাচল খুবই কমে গেছে। রাজধানীর শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত দূরত্ব দুই কিলোমিটার। এই পথে নড়বড়ে এমন চারটি বাস এই প্রতিবেদকের নজরে আসে। পরে বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দুটির ফিটনেস সনদ নেই। বাকি দুটির সনদ থাকলেও একেবারেই লক্কড়ঝক্কড়।

বাস্তবতার সঙ্গে কাগজের মিল নেই
বেলা তিনটার দিকে গাবতলীর পর্বত সিনেমা হলের সামনে ব্রাদার্স পরিবহনের ঢাকা মেট্রো ব-১১-৩৬০০ নিবন্ধন নম্বরের আরেকটি বাসেরও পেছনের কাচ ভাঙা দেখা যায়। পুরো বাসেই আঁচড়ের দাগ। বিআরটিএর তথ্য বলছে, এটির রুট পারমিট আছে, তবে ২০১৬ সালের পর নবায়ন করা হয়নি। ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের এপ্রিলে। ওই বছর থেকে সরকারি ট্যাক্সও দেওয়া হচ্ছে না। একই স্থান থেকে চলাচলকারী প্রত্যাশা পরিবহনের বাসগুলোও লক্কড়ঝক্কড়। তবে এগুলোর তথ্য যাচাই করা হয়নি।

বিআরটিএ ও মালিক-শ্রমিক সূত্র বলছে, ফিটনেসবিহীন যেসব যানবাহন চলছে, সেগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাসোহারা দিয়েই চলছে। দালাল ও সরাসরি ঘুষের মাধ্যমে ফিটনেস সনদ দেওয়ার সময় বাস-মিনিবাস না দেখেই বিআরটিএ কর্মকর্তারা সনদ দিয়ে দেন।

বিআরটিএর সক্ষমতাই নেই
বিআরটিএর হিসাবে, সারা দেশে বাস, ট্রাক, কারসহ মোট যানবাহন প্রায় ৩৫ লাখ। গাড়ি চালনার লাইসেন্স আছে এমন ব্যক্তি ১৮ লাখ। আর একই চালক একাধিক যানবাহন চালালেও লাইসেন্সধারী ২৬ লাখ। অর্থাৎ অবৈধ চালক ৯ থেকে ১৭ লাখ। এর মধ্যে ঢাকায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন ২ লাখ ১৬ হাজার। গত পাঁচ দিনে সংস্থাটির মিরপুর কার্যালয়ে প্রায় ৫ হাজার যানবাহনের ফিটনেস দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে দেওয়া হয় ৩ হাজারের মতো। এই সপ্তাহে নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬০০। আগের সপ্তাহে ছিল এর অর্ধেক। চালক লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে ৮৪৫ টি। আগের সপ্তাহে তা ছিল ৪২০টি।

ফিটনেস সনদ প্রদান, লাইসেন্সের পরীক্ষা গ্রহণ ও লাইসেন্স নবায়নে মূল ভূমিকা পালন করেন মোটরযান পরিদর্শকেরা। গত এক সপ্তাহে মিরপুর কার্যালয়ে এই শ্রেণির কাজ হয়েছে ৯ হাজার ৪৪৫ টি। গতকাল বৃহস্পতিবার পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন ১৮ জন। সে হিসাবে প্রত্যেককে প্রতিদিন গড়ে ৫০৫টি কাজে ভূমিকা রাখতে হয়েছে।

এসব পরিদর্শক যদি শুধু ফিটনেস সনদ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলেও প্রত্যেককে দিনে অন্তত ৫৫টি গাড়ি পরীক্ষা করতে হয়েছে। যা অসম্ভব মনে করেন সংস্থাটিরই কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, চাপে পড়ার কারণে পরিদর্শক বাড়ানো হয়েছে। অন্য সময় একেকজন পরিদর্শকের ভাগে শ দুয়েক যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে। তাঁরা দেখে না-দেখে, দালালের মাধ্যমে এই কাজ সারেন।

জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সামর্থ্যের মধ্যে চেষ্টা করছেন। মন্ত্রণালয়ও তৎপর। পুলিশ ও মালিকেরাও নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। সবাই একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

মালিক-শ্রমিকদের তৎপরতা ও বাস্তবতা
সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেন, শৃঙ্খলা আনতে চালকের হাতে চুক্তির বিনিময়ে বাস দেওয়া হবে না। রাস্তায় ফিটনেস সনদ যাচাই করবেন। মালিকেরা অতীতেও একাধিকবার এমন আশ্বাস দিয়েছেন। এবারের উদ্যোগকেও অনেকেই বলছেন মুখ রক্ষার আয়োজন।

বিআরটিএর হিসাবে, ঢাকায় বাস-মিনিবাস চলে প্রায় আট হাজার। আর মালিক আছেন প্রায় আড়াই হাজার। কোম্পানি ২৭৬ টি। এসব কোম্পানির বাস চলে প্রায় ৩০০ রুটে। ঢাকার জন্য করা ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) এটাকে খুবই বাজে ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনেক মালিক ও রুট থাকায় চালকেরা একই পথে চলা অন্য কোম্পানি, এমনকি নিজেদের কোম্পানির অন্য মালিকের বাসের সঙ্গে পাল্লায় লিপ্ত হন। মালিক বেশি হওয়ায় চালকদের নির্দিষ্ট বেতনে চাকরি দেওয়াও কঠিন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল আজমেরি, সুপ্রভাত, স্কাইলাইন, ডিএমকে, গাবতলী-সদরঘাট (রুট-৭) এই পাঁচটি কোম্পানিকে তাদের সমিতি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে বাস-মিনিবাস চালানোর প্রমাণ মেলার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সায়েদাবাদ, ফুলবাড়িয়া, মিরপুর ও মহাখালীতে তাঁদের চারটি দল ফিটনেস যাচাই করছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার সমাধান হচ্ছে ‘রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ’। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি থাকবে চার-পাঁচটা। এর অধীনে সবাই বাস চালাবেন, বিনিয়োগের হার অনুসারে মুনাফা পাবেন। আর চালকেরা নিয়োগপত্র পাবেন। গুলশানে ঢাকা চাকা পরিবহন এই পদ্ধতিতে চলছে বলে সেখানে পাল্লাপাল্লি নেই। এর বাইরে কোনো কিছুতে কাজ হবে না।

যানবাহনের ফিটনেস সম্পর্কে এই অধ্যাপক বলেন, সনদ যারা পেয়েছে তারা ঘুষ দিতে পেরেছে বা তাদের প্রভাব আছে। আর যারা পায়নি তারা ঘুষ দেয়নি বা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। সনদ থাকা না-থাকার মধ্যে পার্থক্য এটুকুই। যন্ত্রের মাধ্যমে যথাযথ কারিগরি পরীক্ষা করলে ঢাকার খুব কম বাস-মিনিবাসই চলাচলের উপযোগী হবে।

Print