যে মসজিদ শক্তি যোগায় পুরো একটি গ্রামকে

February 2, 2018 at 9:44 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মরোক্কোর শশব্যস্ত শহর মারাকেশ থেকে আরো দক্ষিণে একঘন্টা মতো গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় তাদমামেত গ্রামে। এটলাস পর্বতের কোলে এই গ্রামটিকে প্রকৃতি সযত্নে সারা বিশ্বের কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছে যেন। এর সবচেয়ে কাছের গ্রামটিও এর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তাদমামেত গ্রামটি বিচ্ছিন্ন হলে কী হবে? এ কারণেই হয়ত গ্রামের ৪০০ বাসিন্দা একেবারে সহজ সরল জীবনযাপন করেন । পাহাড়ি জমিতে পরিশ্রমে ফলানো বার্লি, আলু, আপেলই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। বেশিরভাগ বাসিন্দার গাড়ি নেই। সেখানে আপনি কোনো স্মার্টফোন কিংবা ইন্টারনেটের সংযোগও পাবেন না। বিদ্যুতের অভাব লেগেই থাকে, বিশেষত শীতকালে।

কিন্তু স্বল্পোন্নত এই সহজ সরল গ্রামটিই একদিন বিশ্ববাসীর নজরে এলো। নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে একের পর এক উৎসের সন্ধান করছিল তারা। তখন তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ালো গ্রামের সবার প্রার্থনার জায়গা, তাদের মসজিদটি। এ ছিল এক অভূতপূর্ব উৎস। ২০১৬ সালে তাদমামেত গ্রাম দাবি করে, তারা দেশের প্রথম সৌরশক্তি সম্পন্ন মসজিদ তৈরি করেছে। মসজিদের ছাদ পুরোটা ফটোভোলটাইক সৌর প্যানেল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে । মসজিদটি এত বেশি শক্তি উৎপাদন করে যে শুধু মসজিদ কিংবা ইমাম সাহেবের বাড়ি নয়, গ্রামের একটা বিরাট অংশের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎশক্তি সরবরাহ করে।

পুরো মসজিদ জুড়ে আছে ফটোভোলটাইক প্যানেল

আন্তর্জাতিক সাহায্য করার জন্য জার্মান সরকারের একটি সংস্থা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করেছিল। এই সংস্থারই একজন জান ক্রিস্তফ কুন্তসে। তিনি বলেন, মসজিদ থেকে এ ধরনের শক্তি পাওয়ার ঘটনা এই প্রথম। তাদমামেতের মসজিদ থেকে সৌরশক্তি উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াটি কিন্তু একদিনে শুরু হয়নি। এর সূচনা খুঁজতে আমাদের যেতে হবে আরেকটু পেছনে। চার বছর আগে মরক্কোর সরকার একটি পরিকল্পনা করে। উদ্দেশ্য ছিল, দেশে মোট যে বিদ্যুৎশক্তি খরচ হয়, তার পরিমাণ কমিয়ে আনা। বুদ্ধিটা খুব সহজ ছিল। যেসব জায়গাতে জনগণের জমায়েত হয়, সেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো শক্তি খুঁজে বের করা। যেহেতু মরক্কোতে ৫১,০০০ মসজিদ আছে, শুরুটা হল মসজিদ দিয়েই। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে মরক্কো সরকার হাতে নেয় ‘সবুজ মসজিদ’ প্রকল্প। এরই অংশ হিসেবে তাদমামেতের মসজিদটি দেশের প্রথম সবুজ মসজিদ হয়। শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ এই মসজিদটি এখন বাকি সব মসজিদের জন্য অনুপ্রেরণা।

একটি মসজিদের সবচেয়ে বেশি শক্তি ব্যয়িত হয় আলো, শব্দব্যবস্থা, যেমন মাইক, ভ্যাকিউম ক্লিনার, পাখা, পানি ইত্যাদির পেছনে। কিন্তু অন্য গণভবনের মতো এর শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা এত বেশি জটিল নয়। কুন্তসে বলেন, তারা মসজিদ দিয়েই শুরু করার কথা ভেবেছেন মসজিদের সরল শক্তি সরবরাহের কথা ভেবে। মসজিদই সর্বোত্তম স্থান ছিল এই প্রকল্পটি শুরু করার ।

মরক্কো একটি মুসলিম প্রধান দেশ, তাই মসজিদ দেশটির সমাজে একটি বড় জায়গা জুড়ে আছে। তাছাড়া তাদমামেতের মসজিদটি গ্রামের একমাত্র গণভবন। এটিকে বিদ্যালয়ের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। গ্রামের প্রধান কর্তাব্যক্তিদের একজন বলেন, “বাচ্চাদের এখন সুবিধা হয়েছে, যখন তখন তারা এখানে এসে লেখাপড়া করতে পারে, কারণ এখানে আলোর ব্যবস্থা আছে, আগের বিদ্যালয়ে আলোর ব্যবস্থা ছিল না।” তাওলী কেবীরা এই গ্রামেরই একজন নারী। তার পরিবার এই মসজিদটির জন্য জমি দান করেছিল। তার এখনো মনে পড়ে সেসব দিনের কথা, যখন মোমের আলোতেই চলতে হতো তাদের। তিনি বলেন, “নামাজের সময় মাঝে মাঝে বাতাসে মোমবাতি নিভে যেত, কিন্তু তারা অন্ধকারেই নামাজ চালিয়ে যেত।”

মসজিদের সাথে কেবীরা

মসজিদটি আলোকিত করেছে এলাকার রাস্তাঘাট। আগে সন্ধ্যা নামার পর এই এলাকা অন্ধকারে ডুবে যেত। কৃষিজমির জন্য পানি সেঁচে একটু বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার অকল্পনীয় ছিল। তাদমামেতের মসজিদে আছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি গরম করার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় ওজুর সময় গরম পানি পায় মসজিদে আসা মুসল্লিরা। মসজিদের অভ্যন্তরে লাগানো হয়েছে কম বিদ্যুৎ খরচ করবে এমন বাতি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। ব্যক্তিগত বাসস্থানে যেহেতু পানি গরম করার ব্যবস্থা নেই, যে কেউ চাইলে মসজিদের পাশের একটি অতিরিক্ত গোসলখানা থেকে গরম পানি দিয়ে গোসল করে যেতে পারে। মসজিদের উদ্বৃত্ত শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে গ্রামের সবখানে। একটা সময়ে মসজিদের বিদ্যুৎ বিল সব গ্রামবাসী মিলে ভাগ বাটোয়ারা করে দিতে হত। এখন আর কাউকে কিছু দিতে হয় না। বরং মসজিদ তাদেরকে আলোকিত করে।

বিদ্যুতের তুলনায় সাশ্রয়ী ও সহজ হওয়ায় সৌরবিদ্যুৎ অনেকেই ব্যবহার করতে চাইতো, কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ তৈরিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের দাম কমলেও তা এখনো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মানুষের হাতের নাগালে আসেনি। তারপরও এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে সচেতনতা ও মানুষের কাছে এর স্বীকৃতি বাড়ছে। অনেকেই বুঝতে পারছে এককালীন খরচ হলেও সৌরবিদ্যুৎ আসলে লাভজনক।

ব্যক্তিগত উদ্যোগ ব্যয়বহুল

প্যারিস পরিবেশ চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৩৪ শতাংশ নির্গমন কমানোর লক্ষ্য নেয় মরক্কো। লক্ষ্য পূরণে মারাক্কেশের বৃহত্তম দুইটি মসজিদসহ দেশের শতাধিক মসজিদকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। পৃথিবীর আর সব দেশের মতোই, দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েছে। গত দশ বছরে অবকাঠামোগত বৃদ্ধির সাথেই তা পরিণত হয়েছে দ্বিগুণে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে খনিজ জ্বালানির উপর। দেশটির প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদনের জন্য জ্বালানির ৯৭ ভাগই আমাদানি করা হয়। কিন্তু দেশটিতে যে শুধু ৩,০০০ ঘন্টার উপর সূর্যের আলো বিদ্যমান তা-ই নয়, তাদের রয়েছে পানি ও বাতাস থেকেও বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার মতো পরিবেশগত অবস্থা। এ কারণে মরক্কো আশা করে, ২০৩০ সালের ভেতরে তারা ৫২ শতাংশ শক্তি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান থেকে নিজেরাই তৈরি করতে পারবে।

বিকল্প হতে পারে বায়ুপ্রবাহ

পুরো গ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা ছাড়াও ‘সবুজ মসজিদ’ পরিবেশবান্ধব। তাদমামেতের লোকেরা তাদের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখতে পারছে। খরা এই পাহাড়ি গ্রামটির এক নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন যেন কোনো জাদুর কাঠির পরশে এই সমস্যা কমে গেছে। আগে যেখানে সপ্তাহে কয়েকবার বাইরে থেকে সেঁচ দেওয়া লাগত, সেই পরিমাণ কমে এসেছে মাসে একবারে। সবুজ মসজিদ প্রকল্পের একটি উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে এর ব্যবহার ও সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা। এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয় ও রেডিওতে সবুজ শক্তির কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়।

মারাক্কেশের একটি মসজিদে কার্বন-ডাই-অক্সাইড কম নির্গত হওয়ার পরিমাণ দেখানো হচ্ছে

মসজিদের ইমাম ও তার সহযোগীরাও মানুষদের বোঝান, কীভাবে সবুজ শক্তির মূলনীতিটি ইসলামের কম অপচয়ের নীতির সাথে মিলে যায়। মসজিদটি শুরু হওয়ার পর থেকে গ্রামের যুবকেরা নতুন কাজ খুঁজে পেয়েছিল। শক্তি সরবরাহ ও যন্ত্রাংশ দেখাশোনা ছাড়াও মসজিদের ব্যবস্থাপনা তাদের জীবনবৃত্তান্তের একটি অংশ হয়ে থাকবে। গ্রামের আর সব সাধারণ বাড়ি পাথর দ্বারা নির্মিত হলেও মসজিদ নির্মাণে তাপানুকূল কাদার ইট ব্যবহার করা হয়। মসজিদের নির্মাতারা এই গ্রামেরই লোক, তারা আগে এই পদ্ধতির নাম শুনলেও হাতে কলমে ব্যবহার করেছে এই প্রথম।

গ্রামপ্রধান ব্রাহিমের কথা দিয়েই শেষ করি-

“মসজিদটি আমাদের ভীষণ গর্বের জায়গা, এটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো!”

Print