সেদিনের বাংলার রাজধানী, আজ চরে ছাগল

August 4, 2017 at 9:46 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দৃশ্য ১
ব্যস্ত রাজপথ। রক্তমৃত্তিকা বিহার থেকে বেরিয়ে জনৈক ভিক্ষু দ্রুত পদে এগিয়ে চলেছেন সেই পথ বেয়ে। এই পথ গিয়ে মিশেছে কর্ণসুবর্ণ নগরীতে। আজ বড় আনন্দের দিন। চিন থেকে এক বিখ্যাত শ্রমণ এসেছেন। হিউয়েন সাং নামের সেই শ্রমণ পায়ে হেঁটে সুদূর চিন থেকে এসেছেন ভগবান বুদ্ধের পদস্পর্শে ধন্য স্থানগুলি দর্শন করতে আর সংগ্রহ করতে প্রাচীন বৌদ্ধ পুথি। তাঁকে নিয়ে যেতে হবে রক্তমৃত্তিকা বিহারে। সেখানেই তিনি আতিথ্য স্বীকার করবেন। তাই তাড়াতাড়ি। যদি চৈনিক শ্রমণ আরও শ্রান্ত বোধ করেন। যদি দেরি হয়ে যায়…

দৃশ্য ২

গৌড়রাজ শশাঙ্কদেব ফিরে আসছেন। কান্যকুব্জরাজ রাজ্যবর্ধন সহসাই নিহত। সমগ্র উত্তরাপথ জুড়ে গুজব প্রবাহিত। শশাঙ্কদেবই নাকি হত্যা করেছেন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে। কিন্তু আর কেউ না জানুন, মহামতি শশাঙ্কদেব জানেন, এই ষড়যন্ত্রে তাঁর কোনও ভূমিকাই নেই। উত্তরাপথের সংকীর্ণ রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে গৌড়রাজ্যকে। এইটাই চিন্তা তাঁর মনে। পারবেন কি এই অসাধ্য সাধন করতে? প্রৌঢ় রাজার কপালে চিন্তার ভাঁজ। রাজপথের দুই ধারে আনন্দ উৎসবের আয়োজন। কিন্তু কিছুতেই মন দিতে পারছেন না গৌড়রাজ। অশ্বারোহী বীর প্রায় নতমস্তকে প্রবেশ করছেন কর্ণসুবর্ণে। ক্রমে ক্ষয়ে আসছে বিজয়তূর্যের ধ্বনি। গৌড়-বাংলার ভাগ্যকাশে সিঁদুরে মেঘের রং লেগেছে। রাক্ষসীবেলা আসন্ন।

দৃশ্য ৩
শশাঙ্কদেব প্রয়াত। রাজধানী কর্ণসুবর্ণকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি কামরূপ রাজারাও। ভাস্করবর্মার মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র অগ্নিবর্মা অতিরিক্ত বিলাসী হয়ে পড়েছেন। সুরা, নর্তকী আর চাটুকারের দল তাঁকে রাজকার্যে মনোযোগী হতেই দেয়নি। এই সুযোগে গৌড় আক্রমণ করেছেন দাক্ষিণাত্যের জয়নাগ। নাগ সেনারা গৌড় লুণ্ঠন করছে। হাহাকার পড়ে গিয়েছে কর্ণসুবর্ণের ঘরে ঘরে। গৌড়ের মানুষ টের পাচ্ছেন এক অদ্ভুত আঁধারের গন্ধ। শুরু হচ্ছে মাৎস্যন্যায়, বাংলার ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। নিষ্প্রদীপ হয়ে পড়ছে রাজধানী কর্ণসুবর্ণ।

না, উপরের তিনটি বর্ণনা কোনও ঐতিহাসিক উপন্যাসের ছেঁড়া পাতা থেকে তুলে আনা নয়। এগুলো বাঙালির ঘুমের মধ্যে হানা দেওয়া স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নও নয়। অথবা এই সব দৃশ্যকল্প সন-এ -লুমিয়েরে দেখা আলো-ছায়ার খেলাও নয়। কারণ এগুলো হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। আজকের বাঙালির কাছে কর্ণসুবর্ণ, রক্তমৃত্তিকা বা শশাঙ্কদেব-জাতীয় নামগুলো তেমন কোনও বার্তা বহন করে না। ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের খসখসে পাতায় তারা আটকে থাকে। মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে, তাদের আর কোনও মূল্যই নেই বেশিরভাগ বাংলাভাষীর কাছে।


ছবি: নিজস্ব

অথচ, কর্ণসুবর্ণ নামের এই শহরটির তো এমনটা হওয়ার কথা নয়। বিলেত বা আমেরিকা হলে কি এমনটা হতো? প্রাচীন রাজধানীর হদিস পেলেই সেসব দেশ হেরিটেজ  সাইট হিসেবে তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যা আমাদের দেশে বসে ভাবাই সম্ভব নয়। এখানে সাঁচী স্তূপের গায়ে প্রেমিক-প্রেমিকারা খোদাই করেন তাঁদের সিগনেচার, তাজমহলের মার্বেল ক্যানসার নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মানুষ অতি ষত্নে সেখানে হনুমান জন্মভূমির খোঁজে আন্দোলন করতে চায়। সেখানে কী করে এক আঞ্চলিক রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ নিয়ে ভাবনা উঠে আসবে মিডিয়াধন্য হয়ে, সে বিষয়ে যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল।

ক’জন বাঙালি খবর রাখেন কর্ণসুবর্ণের? ইস্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইয়ের বাইরে তার অস্তিত্ব নেই বললে কি ভুল বলা হবে? সম্ভবত না। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষ ছাড়া বাংলার আপামরের দায় নেই স্বভূমির এই গৌরবময় অধ্যায়কে মনে রাখার। নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ বা দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বৃহৎ বঙ্গ’-এর মতো ভারী বইয়ের পাতা উল্টোনো সময়সাপেক্ষ কাজ। কিন্তু, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৌড়মল্লার’-এর মতো রুদ্ধশ্বাস উপন্যাসও কি নতুন প্রজন্মের বাঙালি পাঠককে ভাবায়?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও জানা। কিন্তু সত্যিই কেমন আছে কর্ণসুবর্ণ?

হিউয়েন-সাং তাঁর বই ‘জিউ জি’ তে ‘কিলোনসুফলন’ হিসেবে কর্নসুবর্ণের উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, কিলোনসুফলন বা কর্ণসুবর্ণের আয়তন ছিল ৪৪৫০ বর্গফুট। এই রাজধানীর নিকটেই ছিল লো-তো-মি-ছি বা রক্তমৃত্তিকা। ১৯৬০-এর দশকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ থেকে প্রত্নবিদরা এস আর দাসের নেতৃত্বে অনুসন্ধানে যান। সেখান থেকে জানা যায়, মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরর চিরুটি স্টেশনের (যা বর্তমানে কর্ণসুবর্ণ স্টেশন নামে পরিচিত) নিকটবর্তী যদুপুর গ্রামের রাক্ষসীডাঙ্গার কাছে রক্তমৃত্তিকার বা রাঙামাটি অবস্থিত ছিল। শুরু হয় খননকাজ।

রাক্ষসীডাঙ্গার ধ্বংসস্তূপ খননে আনুমানিক সপ্তম শতকের বৌদ্ধ বিহারের ভিত্তিচিহ্ন পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘রাজা কর্ণের প্রাসাদ’ নামে পরিচিত। তবে ভাঙনের ফলে অনেক চিহ্ন মুছে গিয়েছে। উৎকীর্ণ লিপি-সহ পোড়ামাটির ফলক উদ্ধার হয়। এতে ‘রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার’ নামের উল্লেখ রয়েছে। তা ছাড়া সেখানে পোড়ামাটির বিভিন্ন সামগ্রীও উদ্ধার হয়েছে। সম্রাট আশোকের সময় থেকে চলে আসা মাটির শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বসে আছেন গ্রামের কয়েকটি পরিবার। শশাঙ্ক কর্ণসুবর্ণকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। জোর দিয়েছিলেন পোড়া মাটির শিল্পের ওপর। গ্রামের মানুষকে উৎসাহিত করেছিলেন এই শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে এলাকাকে সমৃদ্ধ করার।

তাই কর্ণসুবর্ণের অধিকাংশ বাড়িতেই তখন ব্যবহৃত হত পোড়ামাটির বাসনপত্র থেকে শুরু করে গৃহস্থালীর নানা সরঞ্জাম। সে কথা নীহাররঞ্জন ও দীনেশ সেন উভয়েই দেখিয়েছেন। রাজা শশাঙ্কের ভাবনার বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছিল কাঁঠালিয়ার মতো কয়েকটি গ্রাম। শুধু মাটির থালা, গ্লাস নয়, এই গ্রামে একদা গড়ে উঠেছিল পুতুল তৈরির কারখানা। এখনও এলাকার কোনও কোনও বাড়িতে লাল-সাদা পুতুলগুলো অন্দরসজ্জার অঙ্গ হিসেবে শোভা পায়। কলকাতার শিল্পগ্রামে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে শশাঙ্কের আমলের পোড়া মাটির সামগ্রী বাসনকোসন রাখা রয়েছে।

প্রথম দিকে অবহেলায় পড়ে ছিল একসময়ের ইতিহাসের সাক্ষী এই মঠটি। কিন্তু বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এটিকে দেখাশোনা করে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের জামাকাপড় শুকোতেন, বিকেলে বসে আড্ডা মারতেন, তাস খেলতেন। যত্রতত্র চড়ে বেড়াত গোরু, ছাগল। চারিদিকে দেওয়াল তুলে দেওয়ায় বর্তমানে সেটিকে এই উপদ্রবের হাত থেকে বাঁচানো গিয়েছে। ঐতিহাসিক স্থান হলেও জেলার অন্যান্য ভ্রমণস্থানগুলোর মতো এটি সেভাবে কোনওদিন সমাদর পায়নি। তবে সম্প্রতি বেশ কিছু প্রচারের ফলে কিছুটা হলেও মানুষ আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

কিন্তু, মাত্র কয়েকজন ভ্রমণপাগলের আগ্রহ কি হাল ফেরাবে এই ঐতিহাসিক স্থানটির? পর্যটক আকর্ষণের ব্যাপারে আর একটু কি সচেতন হবে প্রশাসন?

ঘুরে আসতেই পারেন রক্তমৃত্তিকা-কর্ণসুবর্ণ। বহরমপুরে যে কোনও হোটেলে থেকে লালবাগ, হাজারদুয়ারি, বড়নগর ট্যুরের সঙ্গে একটা বেলা রাখুন সপ্তম শতকের বাংলার ইতিহাসের সাক্ষী কানসোনা আর রাঙামাটির জন্য। ঠকবেন না।

Print