আরডিএ’র আবাসিক প্রকল্পের টাকায় দু’দফায় ১৪ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

১০ বছরে লাখ লাখ টাকা খরচ হলেও প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। সাত বছর আগে মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মকর্তাসহ ১৪ কর্মকর্তা দুই দফায় বিদেশ সফর করেন।

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে আনওয়ার হোসেন (অতিরিক্ত সচিব) যোগদানের পর প্রকল্পটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রকল্পটি বেহাল দেখে তিনি বিস্মিত হন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি দফায় দফায় বৈঠক করেন। তার চেষ্টায় নতুন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরে প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর গোয়ালপাড়া ও কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় ‘প্রান্তিক আবাসিক প্রকল্প’ বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রকল্পটির ব্যয় ৪৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ধরা হয়। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ৩৪ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। প্রায় ২০ একর আয়তনের প্রকল্পটিতে ২৪৫টি প্লট হওয়ার কথা। বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে ৯৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

শুরুতে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। এরপর ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। পর্যায়ক্রমে ২০১৭ সালের ৩০ জুন ও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরপর থেকে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংশোধিত প্রকল্প এলাকায় সাবেক চেয়ারম্যান বজলুর রহমানের নিকটাত্মীয়ের বেশকিছু জমি পড়ে যাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চরম অনীহা শুরু হয়। এরপর দুই বছরে প্রকল্পটি নিয়ে আর কোনো নড়াচড়া হয়নি।

৬ অক্টোবর অতিরিক্ত সচিব আনওয়ার হোসেন আরডিএ’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। ৫ জানুয়ারি আরডিএ’র সমন্বয় সভায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৬ ডিসেম্বর জমি অধিগ্রহণের জন্য রাজশাহীর জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে আরডিএ কর্তৃপক্ষ।

আরডিএ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়াও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আরডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান বজলুর রহমানের নজিরবিহীন অবহেলা ও গাফিলতির কারণে আবাসিক প্রকল্পটির এই হাল হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একটানা পাঁচ বছর চেয়ারম্যানের পদ তিনি আঁকড়ে পড়েছিলেন। সরকারি প্লট নেয়াসহ হাজারও সুবিধা লুটেছেন তিনি।

আরও দুই বছর চেয়ারম্যান থাকার জন্য মরিয়া হয়ে তদবির করেছিলেন; কিন্তু গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী স ম রেজাউল করিমের কঠোর অবস্থানের কারণে আরডিএ’র চেয়ারম্যান পদ বজলুরকে ছাড়তে হয়।

প্রকল্পটির কাজ পিছিয়ে পড়ার জন্য সাবেক চেয়ারম্যান বজলুরই পুরোপুরি দায়ী বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বজলুর রহমান বলেছেন, প্রকল্প এলাকার লোকজন জমি দিতে আপত্তি করায় নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

এদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি না হলেও প্রকল্পের টাকায় ২০১৩ সালে দুই দফায় ১৫ দিন করে ১৪ কর্মকর্তা কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেন। প্রকল্পের টাকা থেকে ১৪ কর্মকর্তার ভ্রমণ ব্যয় বাবদ ৯৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।

প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ভ্রমণকারী কর্মকর্তারা হলেন- গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব এসএম আরিফ উর রহমান, আরডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান নৌপরিবহন সচিব আবদুস সামাদ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজীবুল ইসলাম, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাবেক একান্ত সচিব ও বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রতন চন্দ্র পণ্ডিত, গৃহায়ন অধিদফতরের সাবেক পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক বেগম লুৎফুন্নেসা, মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কোষের সাবেক ডেপুটি চিফ জালাল আহাম্মেদ, সাবেক পূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুর রহমান আকন্দ, আরডিএ’র হিসাব কর্মকর্তা বাসারুল কবির, অথরাইজড অফিসার আবুল কালাম আজাদ, নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল তারিক, সহকারী প্রকৌশলী ও প্রান্তিকের প্রকল্প পরিচালক শেখ কামরুজ্জামান, সহকারী নগর পরিকল্পক রাহেনুল ইসলাম রনি ও সহকারী এস্টেট অফিসার মাজহারুল ইসলাম।

জানা গেছে, প্রকল্পটির টাকায় ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায় একটি নতুন মডেলের প্রাডো গাড়ি (নম্বর-রাজ-মেট্রো-গ-১১-০২২৩) কেনা হয়। প্

রকল্পে নুরুল ইসলাম নামের একজন গাড়িচালকও নিয়োগ করা হয়। গাড়িটি ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকায় আরডিএ’র নিজস্ব রেস্টহাউসে রয়েছে। গাড়িচালক নুরুল ইসলামও ঢাকায় থাকেন। গাড়ির তেল খরচ ও চালকের বেতন-ভাতাও প্রকল্পের টাকা থেকে দেয়া হয়।

অভিযোগ- প্রকল্পের গাড়িটি সাবেক চেয়ারম্যান বজলুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন। এখন পর্যন্ত গাড়িটির কেনা, মেরামত, যাতায়াত ও জ্বালানি খরচ বাবদ ৯০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামান বলেন, নানা জটিলতায় প্রকল্পটি পিছিয়ে পড়েছে। নতুন করে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।

Print