রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের জটিলতা, বোর্ড সভার মিটিংয়েও যান না সদস্যরা

February 12, 2019 at 4:16 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অভ্যান্তরিন জটিলতা যেন ক্রমেই বড় আকার ধারণ করছে দিনের পর দিন। এর ফলে সার্বিক কার্যক্রমে যেন গতি আসছে না কোনোভাবেই। কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, অস্থায়ী কর্মচারীদের আন্দোলন, বোর্ড চেয়ারম্যানের দুর্নীতির তদন্তসহ নানা কাজে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে শিক্ষা বোর্ডে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড পরিচালনার জন্য ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। এই পরিষদ বা কমিটি বোর্ডের বিভিন্ন কাজের অনুমোদনের জন্য সভা করে নিজেদের মধ্যে। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি এই বোর্ড সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু ওই সভায় মাত্র একজন সদস্য উপস্থিত থাকায় সভাপটি পণ্ড হয়ে যায়। এর আগে একই মাসের ১৫ তারিখেও একই সভা আয়োজন করেছিলেন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। বোর্ড পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে তিনি এ সভা আয়োজন করেন। কিন্তু ওই সভাতে তিনি ছাড়া একজন সদস্যও ছিলেন না।

সূত্র মতে, সর্বশেষ ২৫ জানুয়ারির সভা আহ্বান করা হলেও কোনো এজেন্ডা ছিল না। এ কারণে দিনাজপুরের পাঁচবিবি এসএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহের নিগার ছাড়া আর কোনো সদস্য ওই সভায় উপস্থিত হননি।

জানতে চাইলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বোড পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও পাঁচবিবি এসএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহের নিগার বলেন, ‘আমি অনেক দূর থেকেও ওই সভায় উপস্থিত হতে গেছিলাম। কিন্তু অন্য কোনো সদস্যের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ফলে সভাও হয়নি। এ কারণে সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত বসে থাকার পরে চলে এসেছি। তবে সভায় কোনো এজেন্ডা ছিল কি না জানি না।’

জানতে চাইলে বোর্ড পরিচালনা পর্ষদের আরেক সদস্য ও রাজশাহী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, ‘সভা আহ্বান করা হলেও কোনো এজেন্ডা থাকে না। এ কারণে সভায় যাওয়া হয় না। তবে তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো ঝামেলা আছে কিনা জানি না।’

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত প্রায় এক বছর ধরে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এরপর প্রায় ৪০ কোটি টাকা তোছরুপের অভিযোগে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুদক। এখনো তদন্ত চলছে। এই অবস্থায় বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে দেখা দেয় বিভক্ত। বোর্ডের একটি পক্ষ দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ভিতরে ভিতরে বিপক্ষে অবস্থান নিতে থাকেন। আরেকটি পক্ষ চেয়ারম্যানকে রক্ষা করতে তার দিকেই অবস্থান নেন। এ নিয়েও বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাঝে বিভক্ত দেয় প্রায় প্রকাশ্যে। এরই মধ্যে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। তারা শিক্ষা বোর্ডের সকল কাজকর্ম ফেলে গত প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছেন।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের একাধিক সূত্র মতে, বোর্ডের চেয়ারম্যানকে ঘিরেই শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভক্ত চরমে। চেয়ারম্যানের নানা কা-ে অতিষ্ঠ হয়ে কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই অবস্থায় শিক্ষা বোর্ডের সার্বিক কার্যক্রমে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। এরই মধে গত ১৩ জানুয়ারি চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলনকারী কর্মচারীরা উপ-কলেজ পরিদর্শকের উপর হামলা চালায়। পরে তারা বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শকের কার্যালয়ে গিয়েও বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এ নিয়ে উপ-কলেজ পরিদর্শক মঞ্জুর রহমান খান ওইদিন রাতেই বাদী হয়ে ১১ জনকে আসামি নগরীর রাজপাড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

এর আগে আন্দোলনরত কর্মচারীরা সহকারী হিসাব কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামকে লাঞ্ছিত করেন। ৬২ জন অস্থায়ী কর্মচারী গত প্রায় ১৫ দিন ধরে শিক্ষা বোর্ডের কাজ ফেলে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন।

জানতে চাইলে শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘চেয়ারম্যানের কারণেই রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভক্তির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে শিক্ষা বোর্ড। এছাড়াও বোর্ডের আরও এক কর্মকর্তা চাইছেন চেয়ারম্যান হতে। এ নিয়েও চেয়ারম্যানের সঙ্গে দূরুত্ব রয়েছে তাঁর। ফলে শিক্ষা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোও এখন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। আবার বোর্ড সভার মত সভাও পণ্ড হয়ে যাচ্ছে অভ্যান্তরিন দ্বন্দ্বের কারণে।

তবে এসব নিয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শিক্ষা বোর্ডে কোনো বিশৃঙ্খলা হচ্ছে-এটা একটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এখানে অস্থায়ী কর্মচারীরা তাদের চাকরি স্থায়ী করতে আন্দোলন করছে। আবার ইউনিয়নও আছে যারা ভিতরে ভিতরে অভ্যান্তরীন রাজনীতিও করে। তবে এগুলো করে কোনো লাভ হবে না। শিক্ষা বোর্ড ঠিক-ঠাক মতোই চলবে।’

তিনি বলেন, বোর্ড সভা হয় না কারণ কেউ হয়ত প্রভাবিত করছে। তবে দ্রুতই আবার সভা হবে। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা। আমি কি কাজ করি ওই সভাতেই সব অনুমোদন নিতে হয়। এই সভায় কোনো সদস্য পর পর তিন বার উপস্থিত না হলে তার সদস্য পদ থাকে না।’

স/অ

Print