শুধু এসি বদলিয়ে পৃথিবীকে বাঁচানো যায়!

November 7, 2018 at 4:41 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

প্রথমেই বলি, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি ছাড়া জীবন অচল। এটা লাগবেই। বরং দিন দিন আরও বেশি দরকার হবে। আমাদের মতো গরমের দেশে তো বটেই, এখন শীতের দেশেও গরম বাড়ছে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে এসির প্রয়োজন।

আমাদের দেশের কাছাকাছি দেশ সিঙ্গাপুর। কোনো উদাহরণ দিতে হলে আমরা সিঙ্গাপুরের কথা গর্বের সঙ্গে বলি। সেই সিঙ্গাপুরের দ্রুত উন্নয়নের পেছনে অন্য অনেক কিছুর মধ্যে কিন্তু এসির বিরাট ভূমিকা ছিল। সে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান এসিকে ইতিহাসের যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে অভিহিত করে গেছেন। এসি কাজের কক্ষে গরম কমায়, উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এসি চালাতে বিদ্যুৎ লাগে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে লাগে জ্বালানি। এটা পুড়ে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়ায়। এসির ভেতরে ব্যবহৃত কুলিং এজেন্টও (শীতলীকরণ তরল) বাতাসে কার্বন ছড়ায়। ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ে।

এ জন্যই পরিবেশবিদেরা অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি এসিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের একটি বড় কারণ বলে চিহ্নিত করেন। তাঁরা এসির ঘোর বিরোধী। কিন্তু কঠিন সত্যটা হলো ১৯০২ সালে এসি আবিষ্কারের পর থেকে প্রায় ১০০ বছরে বিশ্বে যত এসি বসানো হয়েছে, তার সমান সংখ্যার এসি আগামী ১০ বছরে যোগ হবে। তার মানে আমরা একটা গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি। যত দিন যাবে, গরম তত বাড়বে, তত বেশি এসি লাগবে। তখন বাতাসে আরও বেশি হারে কার্বন ছড়াবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও বাড়বে। আরও বেশি এসি বাজারে আসতে থাকবে। এর শেষ কোথায়? তাহলে তো পৃথিবী অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। কী করা যায়? এক হিসাবে জানা গেছে, এসির আবহাওয়া দূষণকারী রেফ্রিজারেন্ট বদলিয়ে দূষণমুক্ত রেফ্রিজারেন্টের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০৫০ সালের মধ্যে বাতাসে মোট ৯ হাজার কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড কমানো যাবে। আর যন্ত্রের দক্ষতা বাড়িয়ে আরও ৯ হাজার কোটি টন কমানো যাবে। বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে বছরে কার্বন ছড়ায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টন। এসিতে হাইড্রোফ্লুওরোকার্বন নামের একধরনের যে রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা হয়, সেটা বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে এক হাজার গুণের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকায় (আগস্ট ২৫, ২০১৮) এ বিষয়ে বিস্তৃত লেখা বেরিয়েছে। সেখানে অন্য ধরনের দূষণের সঙ্গে তুলনা করে দেখানো হয়েছে এসির দূষণ কত ভয়াবহ। যেমন, বিশ্বের অর্ধেক মানুষ যদি মাংস খাওয়া বাদ দেয় তাহলে ৬ হাজার ৬০০ কোটি টন কার্বন বায়ুমণ্ডলে কম ছড়াবে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উজাড় করা বনভূমির দুই-তৃতীয়াংশ পুনরুদ্ধার করতে পারলে ৬ হাজার ১০০ কোটি টন কার্বন নিঃসরণ কমবে। বিশ্বব্যাপী সাইকেলে চলাচল এক-তৃতীয়াংশ বাড়াতে পারলে ২৩০ কোটি টন কার্বন কমবে। আর সে তুলনায় শুধু এসিতেই কমানো যেতে পারে ১৮ হাজার কোটি টন কার্বন নিঃসরণ!

তাহলে বুঝুন, এসির দূষণ কমাতে না পারলে কি ভয়ংকর পরিণতি হবে।

তার মানে এই না যে এসির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তাহলে তো উন্নয়নের ক্ষতি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো থেকে শুরু করে বনায়ন—এগুলোই আসল লক্ষ্য। কিন্তু সেই সঙ্গে শুধু এসির কাজের দক্ষতা বাড়ানো, নষ্ট এসিগুলো বাদ দেওয়া, পরিবেশসম্মত কুলিং রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা এবং বাসা-অফিসের ডিজাইন এমনভাবে করা যেন কম বিদ্যুৎ-বাতি ব্যবহার করতে হয়, প্রচুর আলো-বাতাস খেলে, যেন এসির ব্যবহার খুব কম লাগে। তাহলে অনেক কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

মস্কোর আন্তর্জাতিক মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট ইনস্টিটিউটে ১৯৮৩ সালে অর্থনীতি-দর্শনে এক বছরের একটি কোর্স করেছিলাম। তখন অধ্যাপক সভেৎলানা একদিন বললেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা মাত্র ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বা কমলে সব প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন এর তাৎপর্য বুঝিনি। আমরা বুঝতে পারিনি যে মাত্র ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার হেরফেরে এমন কী ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে। এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল টাইফুন-টর্নেডোয় প্রায়ই বিধ্বস্ত হচ্ছে, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে। গরমকালে প্রচণ্ড গরম আর শীতে হাড় কাঁপানো শীত। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সাফ এমনকি এভারেস্টচূড়ার বরফও গলতে শুরু করেছে। সবার টনক নড়ছে।

১৮৬০ সালে শিল্পবিপ্লবের সময় থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। তখন ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আইপিসিসি (ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) গত ৮ অক্টোবর ২০১৮ এই তথ্য জানিয়েছে।

জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিল্পবিপ্লবের সময়ের তুলনায় ২০৫০ সালে ২ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা বাড়তে দেওয়া যাবে না। যদি আমরা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া রোধ করে গড় তাপমাত্রা নামিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে উঠবে (ইররিভার্সেবল)। পৃথিবী ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। কিন্তু অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে ২ ডিগ্রিতে কাজ হবে না। দেড় ডিগ্রির মধ্যে গড় উষ্ণায়ন বৃদ্ধি সীমিত রাখতে হবে। আমরা পারব কি?

এর উত্তর একটাই। পারব এবং পারতে হবেই। তবে কাজটা কঠিন। যদি আমরা সব দেশে বিশ্বের সেরা জলবায়ু-সুরক্ষা পদ্ধতি অনুশীলন করি, তেল-কয়লা পোড়ানো সীমিত করি, পরিবেশসম্মত বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়াই, তাহলে হয়তো আমাদের এই পৃথিবী বসবাসযোগ্য করে রাখতে পারব। অবশ্য কাজটি করতে হলে আগামী ২৫ বছরে তেল-কয়লাওয়ালারা ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ মাটির নিচে এখনো যেটুকু তেল-কয়লা রয়েছে, সেগুলো মাটির নিচেই রেখে দিতে হবে।

এরপরও যে বিপর্যয় একেবারে থাকবে না, তা বলা যাবে না। কারণ ইতিমধ্যে মানুষের নির্বিচার কাজের জন্য বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ ক্লোরোফ্লোরো-কার্বন গ্যাস জমেছে, তার পরিণতি আরও কয়েক দশক আমাদের ভোগ করতে হবে। কিন্তু একটা সান্ত্বনা থাকবে। হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের হুমকি কমে যাবে।

আজকের বিশ্বে, সব দেশে, সব মানুষের এক নম্বর দায়িত্ব হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণ কমানো। এর চেয়ে বড় কাজ আর নেই।

Print