সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
ডায়াবেটিস মানেই অনেকে ধরে নেন কেবল রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। তবে সত্যি হচ্ছে, এই রোগের সঙ্গে অন্যান্য অনেক রোগের যোগসূত্র রয়েছে।
এমনকি শরীরের অন্যান্য অঙ্গতেও নীরবে নানা রোগ দেখা দিতে পারে।
লিভারেও প্রভাব ফেলতে পারে এই অতিরিক্ত ডায়াবেটিস। এমনকি বাড়তে পারে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিও। বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আর দীর্ঘদিন এটি চলতে থাকলে শুধু ফ্যাটি লিভারেই বিষয়টি থেমে নাও থাকতে পারে।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানান, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স অতিরিক্ত গ্লুকোজকে চর্বিতে রূপান্তর করে লিভারে জমাতে পারে। শরীর যখন ইনসুলিন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন অতিরিক্ত গ্লুকোজের একটা অংশ চর্বিতে রূপান্তরিত হতে পারে। সেই চর্বি লিভারে জমতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে এই চর্বি জমার পরিমাণ বাড়তে থাকলে তৈরি হতে পারে ফ্যাটি লিভার। এতে লিভারে ফাইব্রোসিস বা ক্ষত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা সিরোসিসেও গড়াতে পারে।
ডায়াবেটিসের কারণে লিভারের ক্ষতির লক্ষণ
অনেকেই ভেবে নেন লিভারের ক্ষতি হলে সেটা হয়তো শুরুতেই বুঝতে পারা যায়। তবে বিষয়টা মোটেও এমন নয়। কারণ লিভার নষ্ট হলে বা কোনো রোগ দেখা দিলে সেটা শুরুতে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না।
তাই নীরবে লিভারের ক্ষতি হতে থাকে। কিছু দিন পর শরীরে বিভিন্ন সংকেত প্রকাশ পায়। এমনকি শুরুর দিকে এমন কিছু লক্ষণ দেখা দেয় যা দেখে রোগী বুঝতেই পারেন না। এমনকি কোনো লক্ষণ দেখা দিলেও, সেগুলোকে সহজেই জীবনযাত্রাজনিত অন্যান্য সমস্যা, যেমন মানসিক চাপ, ক্লান্তি বা হজমের অস্বস্তি বলে ভুল করা যেতে পারে।
ডা. চিনগিলির মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু মানুষের মধ্যে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। এগুলো হলো, সবসময় ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা, পেটের ওপরের ডান দিকে ভারী ভাব বা হালকা অস্বস্তি, পেট ফাঁপা এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। তবে এসব লক্ষণকে অনেকেই সাধারণ ক্লান্তি, মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন বা হজমের সমস্যা বলে ধরে নেন।
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেয়ার আগেই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব। আর এখানেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. চিনগিলির মতে, অনেক সময় রুটিন লিভার ফাংশন টেস্টে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। আবার আল্ট্রাসাউন্ড করাতে গিয়ে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার বিষয়টিও জানা যেতে পারে। অর্থাৎ, আপনি নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ মনে করলেও নিয়মিত পরীক্ষা করলে সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন কোনও উপসর্গ দেখা দেয়ার আগেই।
ডায়াবেটিস থাকলে লিভার ভালো রাখতে
বর্তমান সময়ে অনেকেই ডায়াবেটিসের সমস্যায় ভুগছেন। তবে ডায়াবেটিস মানেই লিভার শেষ বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। ডা. লুবনা চিনগিলি লিভার ভালো রাখতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো-
১. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ : দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
২. ওজন নিয়ন্ত্রণ : অতিরিক্ত ওজন লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।
৩. নিয়মিত শরীরচর্চা : ব্যায়াম শুধু ওজন কমাতেই সাহায্য করে না; এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. স্বাস্থ্যকর খাবার : অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমান। পরিবর্তে সুষম খাবার, শাকসবজি, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করুন।
৫. অ্যালকোহল বাদ দেওয়া : অ্যালকোহল লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে এবং আগে থেকেই থাকা লিভারের সমস্যাকে আরো খারাপ করতে পারে।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট : অনেকেই আছেন সুস্থ থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনেই ওষুধ খান। আবার কেউ আস্থা রাখেন সাপ্লিম্যান্টে। এই কাজটা করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনেই কাজ করতে হবে।
৭. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা : বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভার ফাংশন টেস্ট বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
ডায়াবেটিস মানেই লিভার নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই লিভারের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং খাবারের গুরুত্ব দিতে হবে। সমস্যা দেখে দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।









