সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
সারা দিন কাজের চাপ, রাতভর মোবাইল স্ক্রল, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকিত্ব—ধীরে ধীরে যেন মানুষের মনকে ক্লান্ত করে তুলছে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই ডুবে যাচ্ছেন উদ্বেগ, হতাশা আর অবসাদের গভীর গর্তে।
আর এবার সেই আশঙ্কাকেই আরো জোরালো করে তুলল নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণা।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে গবেষণার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণার তথ্য অনুযায়ী—১৯৯০ সালের তুলনায় বিশ্বে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
২০২৩ সালে পৃথিবীতে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগেছে। অর্থাৎ প্রতি ৭ জন মানুষের মধ্যে ১ জন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে আক্রান্ত।
গবেষকরা ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, গত তিন দশকে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আর শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বড় সংকেত।
উদ্বেগ আর অবসাদ—দুই-ই নীরব শত্রু
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে দুটি সমস্যার কথা—অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগজনিত রোগ এবং ডিপ্রেশন বা অবসাদ।
অনেকেই ভাবেন, ‘মন খারাপ’ হয়তো সাময়িক ব্যাপার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অকারণ ভয়, অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, ঘুম না হওয়া, সব কিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া—এগুলো মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, মানসিক রোগ সবসময় শরীরের মতো দৃশ্যমান নয়। তাই অনেক মানুষ বুঝতেই পারে না, ধীরে ধীরে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
কিশোর-তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই মানসিক সমস্যার হার সবচেয়ে বেশি।
একদিকে পড়াশোনার প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা—তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার অদৃশ্য চাপ। অন্যের ‘সুন্দর জীবন’ দেখে নিজেকে ব্যর্থ মনে করা, লাইক-কমেন্টের ওপর আত্মবিশ্বাস নির্ভর করা, একাকিত্ব, পারিবারিক দূরত্ব—সব মিলিয়ে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরে শুরু হওয়া উদ্বেগ বা অবসাদ অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও থেকে যায়। তাই শুরুতেই লক্ষণ চিহ্নিত করা জরুরি।
নারীদের মধ্যে সমস্যা বেশি কেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার বেশি। ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৬২ কোটি নারী এবং ৫৫ কোটির বেশি পুরুষ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার ও কর্মজীবনের দ্বৈত চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ এর পেছনে বড় কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও অনেক নারী নিজের মানসিক কষ্ট নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারেন না। ‘সব ঠিক আছে’ বলেই বছরের পর বছর ভেতরের চাপ বয়ে বেড়ান।
বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্কসংকেত
বাংলাদেশে উদ্বেগ, অবসাদ, স্ট্রেস ও ঘুমজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন। কিন্তু এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে নানা কুসংস্কার রয়েছে।
অনেকেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াকে ‘পাগলের ডাক্তার দেখানো’ হিসেবে দেখেন। ফলে অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা না নিয়েই নীরবে ভোগে।
গ্রামাঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত। অনেক জেলায় পর্যাপ্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। আবার অনেক পরিবার সমস্যাকে গুরুত্বই দিতে চায় না।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
দীর্ঘদিন মন খারাপ বা হতাশা
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ভয়
ঘুমের সমস্যা
অল্পতেই রাগ বা বিরক্তি
একা থাকতে ইচ্ছা করা
কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া
আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা
খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন
বারবার মৃত্যুচিন্তা বা নিজেকে ক্ষতি করার ভাবনা
যেভাবে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব
মানসিক রোগও অন্য যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার মতোই চিকিৎসাযোগ্য—এটি মনে রাখা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কিছু ছোট অভ্যাস বড় ভূমিকা রাখতে পারে—
পর্যাপ্ত ঘুম
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি
সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমা টানুন
ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল না করে নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করার চেষ্টা করুন
মন খুলে কথা বলুন
বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবার বা কাউন্সেলরের সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া মানসিক চাপ কমায়
শরীরচর্চা করুন
হাঁটা, ব্যায়াম বা হালকা যোগব্যায়াম মস্তিষ্কে ‘ফিল-গুড’ হরমোন বাড়াতে সাহায্য করে
নিজের জন্য সময় রাখুন
প্রিয় বই পড়া, গাছের পরিচর্যা, গান শোনা বা ছোট শখও মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে
প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন
‘মন খারাপ’ আর ‘মানসিক অসুস্থতা’ এক নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনে দুঃখ-কষ্ট আসতেই পারে। কিন্তু যখন সেই কষ্ট দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে, তখন সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ, নীরব এই অসুখ শুধু একজন মানুষকে নয়—একটি পরিবার, কর্মক্ষেত্র, এমনকি পুরো সমাজকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তাই এখনই সময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা নয়, সচেতনতা বাড়ানোর। নিজের মনের যত্ন নেওয়াও শরীরের যত্নের মতোই গুরুত্বপূর্ণ—এই সত্যটি যত দ্রুত সমাজ বুঝবে, ততই কমবে নীরব এই সংকটের গভীরতা।









