ইস্টার সানডে বা পুনরুত্থান উৎসবের আনন্দ।। ফাদার নিখিল এ. গমেজ

April 12, 2017 at 9:27 pm

খ্রিষ্টীয় ভালবাসার অন্যতম উৎসব হলো পুনরুত্থান উৎসব। খ্রীষ্ট পুনরূত্থিত হবার মধ্য দিয়ে জগতে আনন্দ, শান্তি, ভালবাসা, নির্ভয়তা ও নব প্রত্যাশার বাণী নিয়ে এসেছেন। পুনরূত্থান শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো- পুনরায় উত্থিত হওয়া, জেগে উঠা, পূর্ণ জীবন লাভ করা, পুনরায় আরম্ভ করা, সতেজ হওয়া, সজাগ হওয়া, প্রত্যাশায় পথ চলা। আদি মন্ডলীর উপাসনার প্রধান পর্ব ছিল এই পুনরুত্থান উৎসব। পুনরুত্থান উৎসব উদ্যাপন করে আদি মন্ডলী যীশুর গৌরবের জীবনের কথা স্মরণ করতো।

 

পুনরুত্থান পর্বটি নতুন ধারণা নয় ইহুদী প্রথার পাস্কা পর্বের নতুন সংস্করণ মাত্র। হিব্রু শব্দ pesach এর অর্থ হলো অতিক্রম করা বা পার হওয়া। pesach পর্বের মাধ্যমে ইস্রায়েল জাতি নিস্তার পর্বের স্মরণ উৎসব উদ্যাপন করতো। pesach শব্দ থেকে গ্রীক শব্দ pascha শব্দটির উৎপত্তি যার আক্ষরিক অর্থ নিস্তার, রক্ষা, পার হওয়া, অতিক্রম করা। এই নিস্তার পর্বটিই পাস্কা নামে পরিচিতি লাভ করে। নিস্তার পর্বের মধ্য দিয়ে ইস্রায়েল জাতি দাসত্ব থেকে মুক্তির ঘটনা স্মরণ করতো। দাসত্ব থেকে মুক্তির উৎসবই নিস্তার পর্ব। যাত্রা পুস্তক ১২ অধ্যায়ে নিস্তার পর্বের বিবরণ পাওয়া যায়। খ্রীষ্টধর্মীয় শব্দার্থ বইয়ের নিস্তার পর্ব বা পাস্কা পর্বের বিষয়ে বলা হয়েছে, “ইহুদীদের একটি মহাপর্ব, প্রতি বছর ‘নিশান মাসের ১৫ তারিখে পর্বটি উদ্যাপিত হয় ( নিশান হলো নির্বাসনোত্তর হিব্রু ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস অর্থাৎ আমাদের মার্চ ও এপ্রিল মাস)। এ পর্বের সময় মিশরীয় দাসত্ব থেকে ইস্রায়েলীদের উদ্ধারের ঘটনাকে স্মরণ করা হয়। খ্রীষ্টিয় নিস্তার উৎসব হলো ঈশ্বরের মেষশাবক যীশু খ্রীষ্টের বলি উৎসর্গ যার দ্বারা মানবজাতি পাপের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের স্বাধীন পুত্র-কন্যা হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে”।

 

দ্বিতীয় ভাটিকান মহাসভার দলিলসমূহের পুণ্য উপাসনা বিষয়ক সংবিধান নিস্তার রহস্যের বিষয়ে বলা হয়েছেম “পুরাতন নিয়মের জনগণের মধ্যে ঈশ্বরের বিষ্ময়তর কাজগুলো মানুষের মুক্তি সাধণে ও ঈশ্বরকে পরিপূর্ণ প্রশংসা নিবেদনে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের কার্যবলীর ভূমিকা স্বরুপ ছিল। এই কার্য তিনি সাধন করেছেন প্রধানতঃ তাঁর যান্ত্রণাভোগ, পুনরুত্থান ও গৌরবময় স্বর্গারোহণের যে নিস্তার রহস্য তারই মধ্য দিয়ে,যার মাধ্যমে “তিনি মৃত্যুবরণ করে আমাদের মৃত্যু নাশ করেছেন এবং পুনরুত্থিত হয়ে আমাদের জীবন ফিরিয়ে এনেছেন। কারণ ক্রুশে প্রাণ ওদওয়ার সাথে সাথে খ্রীষ্টের বক্ষ থেকেই নি:সৃত হয়েছে ‘সমগ্র মন্ডলীর বিষ্ময়কর সংস্কারটি” ( ধারা -৫) পবিত্র নিয়মে খ্রীষ্টই হলো উৎসগীকৃত মেষ যিনি মৃত্যুবরণ করে পুনরুত্থিত হয়েছেন, মৃত্যুকে জয় করে নব-জীবনের সন্ধান দিয়েছেন।

 
তাই পুনরূত্থান খ্রীষ্ট বিশ্বাসীদের জীবনে নব আশা ও প্রত্যাশার বাণী নিয়ে আসে। অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায় খ্রীষ্টের পুনরুত্থান। আমাদের বাস্তবতার পুনরুত্থান আসে রুদ্র প্রকৃতির, রৌদ্র কর তপ্ত সময়ে। ঊষর-ধষর, ধূলি-কণার শুষ্ক পরিবেশ পুনরুত্থিত খ্রীষ্ট আসে বিশ্বাসের নব জাগরণে প্রাণে প্রাণে নব চেতানার দোলা দিয়ে জীবনের শভারম্ভে। পুনরুত্থান  অনুষ্ঠিত হয় বসন্ত ঋতুতে। আর বিশ্ব প্রকৃতি বুকে বসন্ত হলো জীবনের প্রতিক সরুপ। শুষ্ক, জীর্ণ-শীর্ণ মৃত্যুপ্রায় গাছ পালায় নব পল্লবে জেগে উঠে বিশ্ব প্রকৃতি। মৃত্যুপ্রায় প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পায় সর্বলোকে।

 

বিশ্ব প্রকৃতির সাথে একাত্ব হয়ে যীশু খ্রীষ্টের পুনরুত্থান উৎসবও প্রাণে প্রাণে আনন্দের দোলা দেয়। মানুষের মন-অন্তর জুড়ে থাকে প্রত্যাশার বাণীতে। পুনরুত্থিত খ্রীষ্ট তার শুভেচ্ছা বাণীতে বলেন, “তোমাদের শান্তি হোক”। শান্তির আনন্দ বার্তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বাসী মানুষ হৃদয়ে। আশাহত মানুষ তার জায়গানে মুখরিত খুঁজে পায় জীবনের অর্থ। মৃত্যুকে জয় করে খ্রীষ্ট পুনরুত্থিত হন বিশ্ব প্রকৃতিক বুকে। আর বিশ্বাসী মানুষ তার জয়গানে মুখরিত হয়ে গেয়ে উঠে, “কবরে নাই-রে যীশু কবরে নাই”। শূন্য কবর স্বাক্ষ্য দেয় যে-যীশু পুনরুত্থান করেছেন। দিকে দিকে ধ্বনিত হয় আল্লেলুইয়া!  এটাই হলো ইস্টার সানডে বা পুনরুত্থান উৎসবের আনন্দ।

Print