নিজস্ব প্রতিবেদক:
আমের মৌসুম শেষের পথে। তবুও রাজশাহী অঞ্চলের দুই বড় আম উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর বাজারে এখন দাপট নাবি ও বিশেষ জাতের আমের। কাটিমণ, বারি-৪, ব্যানানা, গৌড়মতি ও আশিনা-এই পাঁচ জাতের আম এখন বেশি দেখা যাচ্ছে বাজারে। স্বাভাবিকভাবেই মৌসুমের শেষদিকে সরবরাহ কমে আসায় এসব আমের দামও উঠেছে বেশ চড়া। কিন্তু বেশি দামের এই আমে মাত্রাতিরিক্ত হারে কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাগিং আমের বাইরে যেসব আম আছে, সেগুলোতে দুই-তিনগুন হারে বেশি কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। আবার ব্যাগিং করা আমের গাছের পাতাতেও কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে পোকা দমনে।
চাষিদের কেউ কেউ বলছেন, গাছে আম ধরে রাখতে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে ৩-৫ দিন পরপর পাতায় কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। ফলে এসব আমে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ আম পাতা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করছে। সেই হিসেবে কীটনাশকে ভরা থাকছে আম।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমে মাত্রাতৃক্ত হারে কীটনাশক স্প্রে করা হলেও সেটি ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত যেতে (পাকতে) ৮-১২ দিন সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে যদিও কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে, কিন্তু সেই কীটনাশকের কার্যকরিতা আর থাকছে না। ফলে কীটনশাকের জন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকিও থাকছে না এসব আম খেলে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় প্রায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। জেলায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন। নওগাঁর সাপাহার, পোরশা, পত্নীতলা, নিয়ামতপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপকভাবে নাবি জাতের আম উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে বারি-৪, গৌড়মতি, ব্যানানা ও কাটিমনের চাষ দিন দিন বাড়ছে। অনেকেই আম্রপালি গাছের ডালপালা কেটে কাটিমন বা গৌড়মতি জাতে রুপান্তর করছেন।
অন্যদিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও কিছুটা বেড়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এই জেলার আমের বাজার হলো-সাপাহার পৌর এলাকার জিরোপয়েন্ট। এখানেই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখনো গড়ে ১০-১৫ ট্রাক আম কেনা-বেচা হচ্ছে। শত শত ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা যোগে আম ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা এনে এই জিরোপয়েন্টে অপেক্ষা করেন। এর পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাওয়া বা স্থানীয় পাইকাররা সেই আম কিনে বিভিন্ন জায়গা পাঠাচ্ছেন।
এ বাজারে গত বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে কথা আম বিক্রি করতে আসা সাপাহারের সাপাহারের ঠাকরাপাড়া এলাকার অটোরিকশা চালক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমি বাগান মালিকের আম নিয়ে এসেছি বিক্রি করতে। বাগান মালিক জমসেদ আলী প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে আমচাষ করেছেন। এখন আম শেষের দিকে। গৌড়মতি আর বারি-৪ জাতের আম এনেছি। এগুলো বিক্রি হচ্ছে ৬-৭ হাজার টাকা মণ দরে। তবে এক সপ্তাহ আগের চেয়ে আমের দাম কিছুটা কমেছে।’
ওই উপজেলার শিয়াড়া গ্রামের বাসিন্দা নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে আমচাষ করেছি। আরও মাস দুয়েক আমার আম থাকবে। এই দুই মাস বিক্রি হবে কাটিমণ জাতের আম। কবে আম ধরে রাখতে এখন প্রচুর স্প্রে করতে হচ্ছে। পানি হচ্ছে। পাশাপাশি পোকার আক্রমাণ বাড়ছে। সে কারণে তিন-চার দিন পর পর স্প্রে করতে হচ্ছে। তবে এই স্প্রেতে কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ আম ভাঙ্গার অন্তত ১০-১২ দিন পরে পাকবে এগুলো। ততদিন বিষের কোনো কার্যকরিতা থাকবে বলে মনে হয় না।’
তিনি বলেন, ‘এখন কাটিমণ জাতের আম বিক্রি হচ্ছে ৪-৭ হাজার টাকা মণ দরে। আর ব্যানার বিক্রি হচ্ছে ১৮-২০ হাজার টাকা মণ দরে। তবে ব্যানানা আম এখন তেমন নাই। দুই-একজনের আছে। আমার আজকেই শেষ হবে এই আম।’
পোরশার শুঁড়িপুকুর এলাকার বাসিন্দা ও আমচাষি হযরত আলী বলেন, আমার ১২ বিঘা জমিতে আম বাগান আছে। এসব জমিতে আগে ধান হতো। ১৫-১৬ বছর ধরে এখন আম চাষ করছি। উন্নতজাতের আম চাষ করছি বলে ভালো টাকাও হচ্ছে। খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি অন্তত এক লাখ টাকা থাকছে।’
সাপাহারের এই বাজারে মৌসুমের শেষ সময়ে (গত ১২ জুলাই) আশিনা প্রতি মণ ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা কাটিমণ ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা, গৌড়মতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, বারি-৪ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা এবং সবচেয়ে বেশি দামে ব্যানানা আম ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা মণ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে এখন ব্যানানা আম নাই। আশিনা বিক্রি হচ্ছে ২৫০০-৪০০০, কাঠিমণ ৬-৯ হাজার। বারি ফোর শেষের দিকে। দুই-চারদিন আর পাওয়া যেতে পারে। বারি ফোর বিক্রি হচ্ছে ৮-১০ হাজার।
সাপাহার ও পোরশা থেকে ফেরার পথে কথা দেখা যায়, যেসব আম বাগানে আম এখনো ঝুলছে সেসব বাগানের বেশ কয়েকটিতে শ্রমিকদের কীটনাশক স্প্রে করতেও দেখা যায়। এসমময় কথা হয় পোরশার সরাইগাছি গ্রামের আসলাম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাগানে বিষ না করলে এখন আম ধরে রাখা যাচ্ছে না। পোকার আক্রমণ খুব বেশি। তাই বিষ করতেই হচ্ছে তিন-পাঁচ দিনের মধ্যেই। আম টেকাতে হলে বিষ করতে হচ্ছে। না হলে আম থাকবে না। এখন যাদের আম আছে, তারা সবাই এটিই করছে।’
একই চিত্র দেখা গেছে, চাঁপাইনবাগঞ্জের, নাচোল, গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জেও। এই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বৃহৎ আম বাজার কানসাটেও আমের প্রায় একই দাম। এখানেও প্রায় একই দরে আম কেনা-বেচা হচ্ছে।
এ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার আম চাষি মাইনুল ইসলামসহ আরও অনেকের ভাষ্য, মৌসুমের শেষদিকে গাছে থাকা আম পোকামাকড় ও বিভিন্ন রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে বাড়তি যত্ন নিতে হয়। অনেক বাগানে কয়েক দিন পরপর পাতায় কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। এতে গাছের পাতা ও ফলকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা গেলেও, সঠিক মাত্রা ও নির্ধারিত বিরতি না মেনে কীটনাশক প্রয়োগ করা হলে আমে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাগিং আমের বাইরে যেসব আম আছে, সেগুলোতে দুই-তিনগুন হারে বেশি কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। আবার ব্যাগিং আমেও কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে পীঁপড়া আর মিলিবাগ পোকবা দমের জন্য। বাজারে বেশি দামের ব্যানানা, গৌড়মতি, বারি-৪ ও কাঠিমণের মতো আমগুলো গাছে দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের অভিযোগ উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বাজারে বিক্রি হওয়া এসব আমে আসলেই কতটা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে, তা পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলেও দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা সামিউল হাসান বলেন, কয়দিন আগে আমি কিনেছিলাম। কিন্তু খেতে গিয়ে দেখি আমের একদিকে পেকেছে আরেকদিকে পাকেনি। আবার আমের স্বাদও কম। এতো দেরিতে আম কিভাবে গাছে থাকছে বুঝে আসে না। ১০-১৫ বছর আগে তো এই সমযে আম পাওযা যেত না। শুনেছি এখন প্রচুর বিষ দেযার কারণে আম গাছে থাকছে। তাহলে বিষের কারণে আম ওপরে ভালো থাকলেও ভিতরে ঠিকমতো পাকছে না? যদি তাই হয়, তাহলে আম পরীক্ষা করে দেখা উচিত যে এতে ক্ষতিকারক কোনো কিছু থাকছে কিনা? যা দেহের কোনো ক্ষতি হতে হতে পারে কিনা সেটাও দেখা উচিত।
পোরশার বড় মসজিদ এলাকার আমচাষি মাহমুদ হসান বলেন, আমরাও আমচাষ করি। মাঝ ভাদ্রে এসেও গাছে আম রাখার একটায় উপায় বিষ স্প্রে করা। গাছে তিন-পাঁচদিন পর পর বিষ স্প্রে না করলে আম এখন রাখতেই পারবে না। আর ওই বিষ তো আমে থাকবেই। ব্যাগিং করা হলেও বিষ আম টেনে নিবে। তাতে আম স্বাভাবিকভাবে পাকবে না এটাই সঠিক।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরফ উদ্দিন বলেন, ‘ব্যাগিং করা আমের বাইরে যেসব আম আছে, সেগুলোতে অতিরিক্ত কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে এটা নিয়ে সন্দেহ নাই। তবে এই কীটনাশক স্প্রে করার অন্তত ১০-১২ দিন পরে আম পাকতেছে। ফলে ততদিনে আমে ক্ষতিকারক কোনোকিছু থাকছে বলে মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশে যেসব কীটনাশক ব্যবহার হয়, সেসবের কার্যকরিতা খুব বেশিদিন থাকে না। এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই কার্যকরিতা নষ্ট হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাগিং করা আম গাছে কীটনাশক স্প্রে করলেও সেটা আম পর্যন্ত পৌঁছায় না। কাজেই আমে কীটনাশকের কারণে কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁিক হয় না।’ #









