ধর্ম

বাগদাদের পতনের পর মুসলিম সভ্যতার পুনর্গঠন

নিউজ ডেস্ক২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

আব্বাসী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ। ইউরোপ-আমেরিকা যখন মধ্যযুগীয় অন্ধকারে নিমজ্জিত এ শহরে তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ।

একদিকে বিস্ময়কর নগরশিল্প, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাদীক্ষার আকাশছোঁয়া উৎকর্ষ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে সেই আরব্য রজনীর রূপকথার গল্পের শহর।
অষ্টম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এ শহর তিন শতাধিক বছর ধরে ছিল আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী এবং একই সঙ্গে ছিল মানবসভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। এখানে ছিল বিখ্যাত ‘বাইতুল হিকমাহ’ বা জ্ঞানের ঘর। যে ঘরের পিঠে ভর করে পৃথিবী এগিয়ে চলছিল মানবসভ্যতার মহা উৎকর্ষের পথে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যাসহ এমন কোনো বিষয় ছিল না, যা নিয়ে সেখানে এক্সপেরিমেন্ট চলছিল না। বাগদাদের আলো-বাতাসেও ছড়িয়ে পড়েছিল জীবনোৎকর্ষের ঘ্রাণ, রাস্তায় রাস্তায় ছিল হাসপাতাল, লাইব্রেরি, মাদরাসা।

যে জন্য ঐতিহাসিক জাস্টিন মারোজি একে বলছেন ‘গ্রহের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজধানী’। দ্বাদশ শতাব্দীর সেই বাগদাদ যেন পৃথিবীর বুকে একটুকরো স্বর্গ এবং সেই সময়টাও মানব ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল মুহূর্ত।

কেউ কল্পনাও করেনি, এই অনিন্দ্যসুন্দর নগরী এবং এর সবকিছু একদিন এক সপ্তাহের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে; কিন্তু বর্বর মঙ্গোল ঝড়ে তাই ঘটে গেল পৃথিবীর বুকে।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যখন পূর্বসূরিদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে জৌলুসহীন হয়ে পড়ে আব্বাসী খেলাফত, তখন মঙ্গোলদের দৃষ্টি পরে এ ভূখণ্ডের দিকে। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তাঁর নাতি হালাকু খানের হাতে আসে পশ্চিমে অভিযানের দায়িত্ব। তিনি মরুঝড়ের ন্যায় সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে এগিয়ে যান মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদের দিকে।

১২৫৮ সালের ২৯ জানুয়ারি।

ক্ষুধার্ত শকুনের মতো তারা নেমে আসে বাগদাদের আকাশে। দেড় লাখ সেনা নিয়ে হালাকু খান বাগদাদ অবরোধ করেন। খলিফা মুস্তাসিম বিল্লাহর ভুল বিশ্বাস এবং প্রধান উজির ইবনে আলকেমির বিশ্বাসঘাতকতার ফলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ শহরের পতন হয় এবং তারপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দুই লাখ থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়। বাদ যায়নি নারী-শিশুরাও। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নগরী বাগদাদ। পচা লাশের গন্ধে ছড়িয়ে পরে মহামারি। বাইতুল হিকমাহর অগণিত পাণ্ডুলিপি ছুড়ে ফেলা হয় টাইগ্রিস নদীতে। কথিত আছে, এত বই ফেলা হয়েছিল যে নদীর পানি বইয়ের কালিতে কালো হয়ে গিয়েছিল।

খলিফা আল-মুস্তাসিমকে বন্দি করা হয় এবং মঙ্গোল ঐতিহ্য অনুযায়ী কার্পেটে পেঁচিয়ে ঘোড়ার পায়ে পিষে হত্যা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ৫০০ বছরের আব্বাসী খেলাফতের প্রকৃত ক্ষমতার এখানেই সমাপ্তি ঘটে।

বাগদাদ পতনের ফলে স্থবির হয়ে যায় পুরো মুসলিম বিশ্ব, নেমে আসে গভীরতম হতাশা। বহু ঐতিহাসিক এই মুহূর্তটিকে ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছেন। একদিকে বিপর্যস্ত জনসাধারণের পরাজিত মানসিকতার নিদারুণ হাহাকার।

অন্যদিকে মোঙ্গল বাহিনীর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ। তখনো তারা সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, একের পর এক শহর জয় করছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো মুসলিম বিশ্বই হয়তো মঙ্গোলদের কালো থাবায় বিলীন হয়ে যাবে।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল ভিন্ন কিছু। সেই হতাশার সময়ই ফিলিস্তিনের আইনে জালুত এলাকায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের মোড় সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা। বাগদাদ পতনের মাত্র আট বছরের মাথায় মোঙ্গল বাহিনী মিসরের সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ ও সেনাপতি রোকনুদ্দিন বাইবার্সের নেতৃত্বে মামলুক সালতানাতের মুখোমুখি হয় এবং অভাবনীয়ভাবে পরাজিত হয় রক্তপিপাসু মোঙ্গলরা। এটাই ছিল মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রথম বড় সামরিক পরাজয়, যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে তারা অজেয় নয়। এর পর থেকেই পুনরুত্থান শুরু হয় এবং তিনটি ধাপে আবারও হারানো জৌলুস ফিরে পায় মুসলিম সভ্যতা।

প্রথমত, বাগদাদ ধ্বংসের পরপর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ক্ষমতার কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য মুসলিম ভূখণ্ডে। আইনে জালুতে মঙ্গোলদের হারানোর পর মামলুকরাই মুসলিম বিশ্বের হাল ধরে এবং কায়রোকে নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলে। এমনকি সেখানে প্রতীকী আব্বাসী খেলাফতও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। পাশাপাশি অপর মঙ্গোল সাম্রাজ্য গোল্ডেন হোর্ডের শাসক বের্কে খানের সঙ্গে সন্ধি করে হালাকু বাহিনীর প্রতিরোধও অব্যাহত রাখে।

দ্বিতীয়ত, খোদ মঙ্গোলদের মধ্যেই ঘটে যায় বিস্ময়কর পরিবর্তন। কালক্রমে তারাই হয়ে ওঠে মুসলিম সভ্যতার রক্ষক। হালাকু খানের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য ইলখানাতের মোঙ্গল শাসকরা ধীরে ধীরে তাঁদের অধীন মুসলিম ভূমির সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের প্রভাবে প্রভাবিত হতে থাকেন।

অবশেষে ১২৯৫ সালে ইলখানাতের নতুন শাসক গাজান খান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে নেন। এটাকে মিরাকলই বলা যায়। যে বংশ একদিন খলিফাকে হত্যা করেছিল, বাইতুল হিকমাহ পুড়িয়েছিল, লাখ লাখ মুসলিমকে হত্যা করেছিল, সেই একই বংশের শাসক মাত্র ৩৭ বছর পর নিজে থেকেই ইসলাম গ্রহণ করছেন। এবং শুধু তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ইলখানাতের অসংখ্য মোঙ্গল অভিজাত ও সাধারণ মানুষও ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে।

গাজান খানের শাসনামলে ইসলাম হয়ে ওঠে ইলখানাতের রাষ্ট্রধর্ম। তাঁর এবং পরবর্তী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাবরিজ ও অন্যান্য শহরে নির্মিত হয় নতুন মসজিদ, মাদরাসা ও স্থাপত্যকীর্তি। যে শক্তি একদিন ইসলামী সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই শক্তিই পরিণত হয় তার নতুন পৃষ্ঠপোষকে।

তৃতীয়ত, এই দীর্ঘ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল দেখা যায় পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে। মুসলিম বিশ্বে জন্ম নেয় তিনটি বিশাল, শক্তিশালী সাম্রাজ্য। ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যে সাফাভি সাম্রাজ্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মোগল সাম্রাজ্য।

ঐতিহাসিকরা এই তিন সাম্রাজ্যকে একসঙ্গে ‘গানপাউডার এম্পায়ার বা বারুদ সাম্রাজ্য’ নামে অভিহিত করেন। কারণ এরা আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, সুবিশাল স্থাপত্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতাকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায়, বাগদাদ-পূর্ব যুগের চেয়েও বিস্তৃত ও শক্তিশালী রূপে।

এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় এক অধ্যায়। বাগদাদের ইটের দেয়াল ও লাইব্রেরিগুলো ধ্বংস হলেও মুসলিম সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে তা ছাইভস্ম থেকে পুনরুত্থিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন এক গৌরবময় অধ্যায়ের রচনা করেছিল।

তথ্যঋণ : খতিবে বাগদাদি, তারিখু মাদিনাতিস সালাম; ইবন কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-১৩; জাস্টিন মারোজি, বাগদাদ : সিটি অব পিস, সিটি অব ব্লাড; পিটার জ্যাকসন, দ্য মঙ্গোলস অ্যান্ড দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড : ফ্রম কনকোয়েস্ট টু কনভার্সন; জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা; মার্শাল জি এস হজসন, দ্য ভেঞ্চার অব ইসলাম, খণ্ড-৩ ও দ্য গানপাউডার এম্পায়ার্স অ্যান্ড মডার্ন টাইমস