ধর্ম

তুরস্কে ৭০০ বছরের পুরানো ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদ

নিউজ ডেস্ক১৭ আগস্ট ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা শুধু আধুনিক নগরসভ্যতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্যই পরিচিত নয়। বরং এর বুকে ছড়িয়ে আছে শত শত বছরের ইসলামী স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের বহু নিদর্শন।

আঙ্কারা দুর্গের পাশে অবস্থিত আসলানহানে মসজিদ—তুর্কি ভাষায় আসলানহানে কামিসি—সেই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি আহি শরাফউদ্দিন মসজিদ নামেও পরিচিত এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত তুরস্কের প্রাচীনতম টিকে থাকা মসজিদগুলোর একটি।
ইতিহাসের পাতায় আসলানহানে

আসলানহানে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে, রুমের সেলজুক শাসক দ্বিতীয় মেসুদের আমলে। মসজিদটির স্থপতি ছিলেন আবুবকির মেহমেত।

তৎকালীন আহি সম্প্রদায়ের দুই নেতা হুসামেত্তিন ও হাসানেদ্দিনের উদ্যোগে এটি নির্মিত হয় বলে জানা যায়। তবে মসজিদের ইতিহাস এখানেই থেমে থাকেনি। ১৩৩০ খ্রিস্টাব্দে শরাফেত্তিন নামের আরেক আহি নেতা মসজিদটির সংস্কার করেন। পরবর্তীকালে তাঁর নামেই এটি আহি শরাফউদ্দিন মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে।

সময়ের প্রবাহে মসজিদটির বিভিন্ন অংশে ছোটখাটো সংস্কার করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তুরস্কের ফাউন্ডেশন মহাপরিচালকের দপ্তরের তত্ত্বাবধানে এর গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধারকাজ সম্পন্ন হয়। ফলে শত শত বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি তার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অনেকটাই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মসজিদটি আঙ্কারার পুরোনো শহরাঞ্চলে, ঐতিহাসিক আঙ্কারা দুর্গের কাছেই অবস্থিত। উঁচু স্থানে নির্মিত হওয়ায় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে আঙ্কারা শহরের বিস্তৃত দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ইতিহাস ও স্থাপত্যের পাশাপাশি এ অবস্থান মসজিদটিকে আঙ্কারার অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত করেছে।
কাঠের স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য স্থাপত্য

আসলানহানে মসজিদের স্থাপত্যে সেলজুক যুগের নির্মাণশৈলীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। প্রায় ৪০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে নির্মিত বর্গাকার মসজিদটির রয়েছে একটি মিনার। এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কাঠের ছাদ। ছাদটি ২৪টি বৃহৎ কাঠের স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। পাথরের তৈরি বিশাল গম্বুজের পরিবর্তে কাঠের স্তম্ভ ও ছাদের ব্যবহার মসজিদটির অভ্যন্তরকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দিয়েছে। ভবনটিতে রয়েছে তিনটি দরজা ও ১২টি জানালা।

মসজিদের মিহরাবও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এটি সেলজুক টালি দিয়ে সজ্জিত, যা মসজিদের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূর্ববর্তী বিভিন্ন স্থাপনা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ফলে মসজিদটির দেয়াল ও নির্মাণশৈলীতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের নিদর্শনের ছাপও দেখা যায়। আসলানহানে নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা। তুর্কি ভাষায় ‘আসলান’ অর্থ সিংহ এবং ‘হানে’ অর্থ ঘর বা স্থান। অর্থাৎ আসলানহানে শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘সিংহের ঘর’। মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও সংস্কারক আহি শরাফউদ্দিনের সমাধি মসজিদের সম্মুখভাগেই অবস্থিত।

আসলানহানে মসজিদ তুরস্কের দীর্ঘ ইসলামী ইতিহাস, সেলজুক স্থাপত্য এবং আহি সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক। প্রায় সাত শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক রূপান্তর ও নগরায়ণের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদ। এর কাঠের স্তম্ভ, সেলজুক টালির মিহরাব, ঐতিহাসিক নির্মাণ উপকরণ এবং শরাফউদ্দিনের সমাধি—সবকিছু মিলিয়ে আসলানহানে মসজিদ আঙ্কারার অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।

আঙ্কারার আধুনিক নগরজীবনের ভেতরে আসলানহানে মসজিদ যেন অতীতের এক নীরব প্রহরী। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মসজিদ আজও দাঁড়িয়ে আছে সেলজুক যুগের শিল্প, স্থাপত্য ও ইসলামী ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। ‘সিংহের ঘর’ নামে পরিচিত এই প্রাচীন মসজিদ তাই শুধু তুরস্কের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি দেশটির সমৃদ্ধ মুসলিম ঐতিহ্য ও বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক মূল্যবান স্বারক।