লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:
জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে একসঙ্গে উজ্জ্বল সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে নাটোরের লালপুর উপজেলার দুই কিশোর-কিশোরী। একজন ফুটবলে টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন, অন্যজন অ্যাথলেটিকসে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে দেশসেরা হয়েছেন। তাঁদের এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গন ও উপজেলাবাসী।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবল প্রতিযোগিতায় রাজশাহী বিভাগের হয়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে আলোচনায় আসেন লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা (ফারিহা মনি)। ফাইনালে রাজশাহী বিভাগ রানারআপ হলেও দলকে ফাইনালে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে একাই করেন চারটি গোল। পরে খুলনা বিভাগের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ে আরও একটি গোল করেন। গুরুত্বপূর্ণ দুই ম্যাচে রাজশাহী বিভাগের করা সাত গোলের মধ্যে পাঁচটিই আসে তার পা থেকে। পুরো আসরে অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়।

লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহার সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। বাবা মুকুল মণ্ডল বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় সংসারের হাল ধরেছেন মা আজেলা বেগম। দিনমজুরির পাশাপাশি সংসারের নানা কাজে ধান রোপণ ও পাট ধোয়ার মতো শ্রমসাধ্য কাজও করতে হয়েছে ফারিহাকে। এরপরও প্রতিদিন প্রায় আট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নাটোরের নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে গিয়ে অনুশীলন করেছে সে। অর্থাভাবে অনুশীলনে যাতায়াত ও খেলাধুলার সরঞ্জাম জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়লেও তার পাশে দাঁড়িয়েছেন কোচ মোহাম্মদ জুয়েল। সামাজিক কটূক্তি ও প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেই জাতীয় পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে এই কিশোরী।
এদিকে একই আয়োজনের জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ২০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশসেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে লালপুর উপজেলার রুইগাড়ী গ্রামের মোহাম্মদ আমান। গত রোববার ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ২৩ দশমিক ৮৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে সে।
মোহাম্মদ আমান রুইগাড়ী গ্রামের মো. আক্তারুজ্জামান ও রোজিনা পারভীন দম্পতির ছেলে। সে রুইগাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এর আগেও অনূর্ধ্ব-১৪ বিভাগে দেশসেরা হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তার।
রুইগাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক গোলাম মোস্তফা আসলাম বলেন, আমানের এই অর্জন বিদ্যালয়ের জন্য গর্বের। তার সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় আরও উৎসাহিত করবে।
রুইগাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও আমানের মা রোজিনা পারভীন বলেন, “এর আগেও অনূর্ধ্ব-১৪ বিভাগে দেশসেরা হয়েছিল আমান। সে আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও সুযোগ পেলে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারে।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওয়াজেদ আলী মৃধা বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমানের এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ফারিহা ও আমানের এই অর্জন পুরো উপজেলার জন্য গর্বের। তাঁদের সাফল্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ী ও কৃতী খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
একজনের পায়ে গোল, আরেকজনের পায়ে গতি। জাতীয় পর্যায়ে দুই কিশোর-কিশোরীর এই সাফল্য প্রমাণ করেছে, প্রত্যন্ত গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন ইতিহাস গড়তে পারে।









