ধর্ম

উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বাভাবজাত বিষয়

নিউজ ডেস্ক৩০ আগস্ট ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

মানুষ স্বপ্ন দেখে বলেই সামনে এগিয়ে যায়। কেউ জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন দেখে, কেউ সমাজে কল্যাণকর পরিবর্তন আনার স্বপ্ন দেখে, কেউ নিজের পরিবারকে সচ্ছল করার চেষ্টা করে, আবার কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতুল ফেরদাউস লাভের আকাঙ্ক্ষায় জীবন সাজায়।

কিন্তু সব উচ্চাকাঙ্ক্ষা এক নয়। কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়, আবার কোনোটি তাকে অহংকার, লোভ ও অন্যায়ের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়।
ইসলাম উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিষেধ করেনি; বরং উচ্চাকাঙ্ক্ষার লক্ষ্য, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করতে শিখিয়েছে। একজন মুমিনের আকাঙ্ক্ষা হবে বড়—কিন্তু তা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকেন্দ্রিক; তার স্বপ্ন হবে উঁচু—কিন্তু তা হবে হালাল পথে; তার সাফল্য হবে কাঙ্ক্ষিত—কিন্তু তা যেন আখিরাতকে বিস্মৃত না করে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা

আল্লাহ তাআলা মানুষকে চিন্তা, বিবেক, সামর্থ্য ও কর্মক্ষমতা দিয়েছেন। তাই জীবনে ভালো কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। ইসলাম মানুষকে অলসতা, নিষ্ক্রিয়তা ও কর্মবিমুখতার দিকে আহ্বান করেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও অধিক প্রিয়; তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।

তোমার জন্য যা উপকারী, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
অর্থাৎ ইসলাম চায় না যে একজন মুসলমান নিজের সামর্থ্যকে অবহেলা করে বসে থাকুক। বরং সে তার প্রতিভা কাজে লাগাবে, লক্ষ্য নির্ধারণ করবে, পরিশ্রম করবে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবে।

মুমিনের সবচেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা—আখিরাত

দুনিয়াবি জীবনে ভালো অবস্থান অর্জনের চেষ্টা করা বৈধ। কিন্তু মুমিনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আখিরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার ফসল বৃদ্ধি করে দিই; আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু অংশ দিই; কিন্তু আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ২০)
এ আয়াত দুনিয়াকে পরিত্যাগ করার শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের লক্ষ্য কোথায় থাকবে, সে বিষয়ে সতর্ক করে। দুনিয়া হবে প্রয়োজন ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র, আর আখিরাত হবে চূড়ান্ত সাফল্যের গন্তব্য।

তাই একজন মুসলমানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা হতে পারে—আমি বড় আলেম হব, দক্ষ চিকিৎসক হব, সৎ ব্যবসায়ী হব, ভালো শিক্ষক হব, মানুষের উপকার করব, জ্ঞান ছড়িয়ে দেব, সমাজের কল্যাণে কাজ করব। কিন্তু এসব আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হবে—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান চাওয়া—উচ্চাকাঙ্ক্ষার অনন্য উদাহরণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ছোট লক্ষ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শেখাননি। বরং তিনি জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও, তখন ফেরদাউস চাও; কারণ এটি জান্নাতের সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ অংশ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৯০)

এখানে মুমিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি অসাধারণ শিক্ষা রয়েছে। যখন জান্নাত চাও, তখন সর্বোচ্চ জান্নাত চাও। অর্থাৎ আখিরাতের ক্ষেত্রে মুমিনের স্বপ্ন ছোট হবে না। দুনিয়ার সাময়িক অর্জনের জন্য মানুষ যদি বছরের পর বছর পরিশ্রম করতে পারে, তাহলে চিরস্থায়ী জান্নাতের জন্য আরো বেশি চেষ্টা করা উচিত।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অহংকার এক জিনিস নয়

উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ এবং অহংকারী মানুষকে এক করে দেখা ঠিক নয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা হলো—আমি আরো ভালো হতে চাই। আর অহংকার হলো—আমি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি নিজের উন্নতির চেষ্টা করে; অহংকারী ব্যক্তি অন্যকে ছোট করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)

সুতরাং একজন মানুষ বড় পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন, প্রচুর সম্পদের মালিক হতে পারেন, উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেন কিংবা সমাজে সম্মানিত হতে পারেন—এগুলো নিজে অহংকার নয়। অহংকার তখনই, যখন সে সত্যকে অস্বীকার করে এবং অন্য মানুষকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে।

ইসলাম দুনিয়ার সফলতা অর্জনেও উৎসাহ দেয়

ইসলাম বৈধ দুনিয়াবি সফলতাকে নিষিদ্ধ করেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। একজন মুসলমান দুনিয়াকে পুরোপুরি ছেড়ে দেবে না, আবার দুনিয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যও বানাবে না। সে সম্পদ অর্জন করবে—কিন্তু হালাল পথে। সে ব্যবসা করবে—কিন্তু প্রতারণা করবে না। সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে—কিন্তু জ্ঞান নিয়ে অহংকার করবে না। সে বড় পদে যেতে চাইবে—কিন্তু অন্যের অধিকার নষ্ট করবে না। সে প্রতিষ্ঠিত হবে—কিন্তু আল্লাহকে ভুলে যাবে না।

উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পরিশ্রম জরুরি

শুধু স্বপ্ন দেখলেই সফলতা আসে না। ইসলাম কর্ম ও প্রচেষ্টার গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তা-ই তার জন্য।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯)

তাই যে ব্যক্তিজীবনে বড় কিছু অর্জন করতে চায়, তাকে পরিশ্রম করতে হবে। জ্ঞান অর্জন করতে হবে, সময়ের মূল্য দিতে হবে, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং বারবার চেষ্টা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনাও হলো—উপকারী বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের জীবনেও ব্যর্থতা আসবে। কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না, কোনো পরীক্ষা আশানুরূপ হবে না, কোনো ব্যবসায় ক্ষতি হতে পারে কিংবা কোনো সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। মুমিন তখন ভেঙে পড়বে না। সে চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকবে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষের জীবনের শক্তি। এটি মানুষকে ঘুমন্ত অবস্থা থেকে জাগিয়ে তোলে, পরিশ্রম করতে শেখায় এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস দেয়। কিন্তু ইসলাম উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে লাগামহীন হতে দেয় না। মুমিনের স্বপ্ন হবে বড়, কিন্তু তার হৃদয় থাকবে বিনয়ী; তার লক্ষ্য হবে উঁচু, কিন্তু তার পথ হবে হালাল; তার চেষ্টা হবে সর্বোচ্চ, কিন্তু তার ভরসা থাকবে আল্লাহর ওপর।

আল্লাহ তাআলা আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পবিত্র করুন, নিয়তকে শুদ্ধ করুন, হালাল পথে চেষ্টা করার তাওফিক দিন এবং আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনে সফল করুন। আমিন।