সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মানুষ ভালোবাসা দিয়ে বাঁচে। একটি আন্তরিক কথা, মমতাভরা দৃষ্টি, স্নেহের স্পর্শ কিংবা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই ছোট্ট বাক্যটি কখনো কখনো একজন মানুষের হৃদয়ে এমন আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে, যা কোনো মূল্যবান উপহারও দিতে পারে না।
অথচ আমাদের সমাজে অনেকেই ভালোবাসেন, কিন্তু প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। সন্তানকে ভালোবাসেন—কিন্তু মুখে বলেন না; বাবা-মায়ের প্রতি গভীর টান অনুভব করেন—কিন্তু কখনো তা জানান না; বন্ধুকে ভালোবাসেন—কিন্তু বলতে লজ্জা পান।
ইসলামের শিক্ষা হলো, ভালোবাসা শুধু অন্তরে লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়; বরং বৈধ ও সুন্দর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালোবাসাকে কথায় ও আচরণে প্রকাশ করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল ভালোবাসা, দয়া, কোমলতা ও মমতার জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

তিনি সাহাবিদের ভালোবাসতেন, সন্তানদের আদর করতেন, স্ত্রীদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন এবং আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসলে তা তাকে জানিয়ে দিতেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন তার ভাইকে ভালোবাসে, তখন সে যেন তাকে জানিয়ে দেয় যে সে তাকে ভালোবাসে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২৪)
হাদিসে ভালোবাসার মানুষকে তা জানিয়ে দিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আন্তরিক ভালোবাসা প্রকাশ করলে সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয় এবং পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। একবার আবু জর (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘হে আবু জর! আমি অবশ্যই তোমাকে ভালোবাসি।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৭৯৭)
মহানবী (সা.) ছিলেন আল্লাহর রাসুল; সাহাবিরা ছিলেন তাঁর সম্মানিত সাহাবি। তবু তিনি ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ করেননি। বরং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সরাসরি বলেছেন—‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।
’
আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা
ইসলামে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ভালোবাসাগুলোর একটি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি অন্য শহরে তার এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেল। পথে আল্লাহ তার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করলেন। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ সে বলল, ‘এই শহরে আমার এক ভাই আছে, তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।’ ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তার কাছে তোমার কোনো পাওনা বা স্বার্থ আছে?’ সে বলল, ‘না; তবে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।’ তখন ফেরেশতা বললেন, ‘আমি তোমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই সংবাদ নিয়ে এসেছি যে, তুমি যেভাবে তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবেসেছ, আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৭)
কী অসাধারণ বিষয়! একজন মানুষ যখন কোনো পার্থিব স্বার্থ ছাড়াই অন্য মুমিনকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, সেই ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসা লাভের কারণ হয়ে যায়।
সন্তানের জন্য ভালোবাসা প্রকাশ করা সুন্নাত
সন্তানকে ভালোবাসা শুধু অন্তরে রাখার বিষয় নয়; তাকে ভালোবাসা অনুভব করানোও জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের আদর করতেন, চুমু দিতেন এবং তাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ইবনু আলী (রা.)-কে চুমু দিলেন। তখন আকরা ইবনু হাবিস (রা.) বললেন, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই চুমু দিইনি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)
অন্য এক বর্ণনায় এক বেদুঈন বলেছিল, ‘আপনারা শিশুদের চুমু দেন? আমরা তো তাদের চুমু দিই না।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমার হৃদয় থেকে দয়া বের করে নিয়ে থাকেন, তাহলে তোমার জন্য আমি কী করতে পারি?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৮)
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও ভালোবাসার প্রকাশ করা জরুরি
পবিত্র কোরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে শুধু দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলেনি; বরং মাওয়াদ্দাহ ও রহমাহ—ভালোবাসা ও দয়াকে আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)
তাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার কথা বলা, একে অন্যের প্রশংসা করা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, সুন্দর নামে ডাকা, অসুস্থতায় পাশে থাকা এবং ছোটখাটো বিষয়ে আন্তরিকতা দেখানো—এসব দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসাকে জীবন্ত রাখে।
শুধু ‘ভালোবাসি’ বলাই ভালোবাসা নয়
ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা একেক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একেক রকম। কখনো ভালোবাসা প্রকাশ পায় কথায়, কখনো কাজে, কখনো সময় দেওয়ার মাধ্যমে, কখনো ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা হতে পারে তাদের সেবা করা ও সম্মান করার মাধ্যমে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা হতে পারে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে সময় দেওয়া ও সঠিকভাবে লালন-পালনের মাধ্যমে। বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা হতে পারে তার অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করা এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে। জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা হতে পারে তার কষ্ট বোঝা, ভুল ক্ষমা করা এবং তার প্রতি কোমল আচরণ করার মাধ্যমে।
অনেক পরিবারে দেখা যায়, মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসে; কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ করে না। ফলে একসময় হৃদয়ের মধ্যে অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়। অথচ একটি ছোট্ট বাক্য—‘তুমি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ’, ‘আল্লাহ তোমাকে উত্তম রাখুন’, ‘আমি তোমার জন্য দোয়া করি’—সম্পর্কে নতুন উষ্ণতা সৃষ্টি করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখের দিকে তোমার হাসি তার জন্য তোমার সদকা।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৬)
তবে ভালোবাসা প্রকাশের অর্থ সীমালঙ্ঘন নয়। ইসলাম ভালোবাসাকে উৎসাহ দিয়েছে, কিন্তু হারাম সম্পর্ক, অশালীনতা কিংবা শরিয়তবিরোধী আচরণকে ভালোবাসার নামে বৈধতা দেয়নি। মাহরাম নয় এমন নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে শরিয়তের পর্দা ও সীমারেখা রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে বৈধ পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক—মা-বাবা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন ও মুমিন ভাইয়ের ক্ষেত্রে ভালোবাসা প্রকাশ করতে হবে।
ইসলামে একটি হাসিও যখন সদকা হতে পারে, তাহলে একটি সুন্দর কথা, স্নেহপূর্ণ আচরণ ও ভালোবাসার প্রকাশও মানুষের হৃদয়ে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়। অতএব, ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার চেয়ে ভালোবাসাকে সুন্নাহর আদব ও শরিয়তের সীমার মধ্যে সুন্দরভাবে প্রকাশ করাই উত্তম।









