সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মাথার ওপর শরতের মেঘের ভেলা। তীব্র রোদ থাকলেও মাঝে মাঝে বাতাসে স্বস্তি।
সেই বাতাস গায়ে মেখে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীর দুই তীরে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) জড়ো হন হাজারো মানুষ। সবার চোখ নদীর জলে। বিকেল ঠিক ৪টায় শুরু হয় নৌকাবাইচ। ‘ঝিলমিল ঝিলমিল’ নৌকাগুলো একে অপরকে পেছনে ফেলার লড়াইয়ে ছুটতে শুরু করে।

বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গাংপার যুব সমাজ গত প্রায় তিন দশক ধরে সুনাই নদীতে এ নৌকাবাইচের আয়োজন করে আসছে। তবে এবার আয়োজন নিয়ে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। নৌকাবাইচ আয়োজনের ঘোষণা আসার পর একটি পক্ষ এর বিরোধিতা শুরু করে। ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারেও এর বিরোধিতা করা হয়।
এ নিয়ে একপর্যায়ে আয়োজন নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।
পরে দেশব্যাপী প্রতিবাদ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় জটিলতার অবসান হয়। সমঝোতার পর পূর্বনির্ধারিত দিনেই শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। তবে সমঝোতার অন্যতম শর্ত ছিল, এ বছর আয়োজন হলেও আগামীতে সুনাই নদীতে আর নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে না।
এবার আগের কয়েক বছরের তুলনায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনদের আমন্ত্রণে অনেকে এসেছেন। সিলেট নগর থেকেও অনেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নৌকাবাইচ দেখতে নদীর তীরে ভিড় করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ইমরান আহমদ চৌধুরীও।
এবারের প্রতিযোগিতায় সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা থেকে তিনটি নৌকা অংশ নেয়। নৌকাগুলোর নাম ‘স্বাধীন বাংলা’, ‘বাঘ’ ও ‘পাগলা নাও’। গানের সুর ও ছন্দের তালে বিকেল ৪টায় শুরু হয় প্রতিযোগিতা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে কখনো দর্শকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা, আবার কখনো উচ্ছ্বাস দেখা যায়। পছন্দের নৌকার সমর্থনে অনেকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্বনির্ধারিত সময়েই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে অন্তত এক দিনের জন্য পুরো এলাকা উৎসবের নগরে পরিণত হয়। তবে নৌকাবাইচের কারণে নদীর দুই তীরের ঘরবাড়ি ও জমিতে প্রভাব পড়ে। নদীভাঙন দেখা দেয়, মানুষের জটলার কারণে ফসলি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার নৌকাবাইচ এবারই শেষ—এ কথা মনে হলে কষ্টও লাগে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ হক বলেন, ‘নৌকাবাইচ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এটি খুবই উপভোগ্য আয়োজন। গ্রামের মানুষ এ প্রতিযোগিতা খুব উপভোগ করেন। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষজন এসেছেন।’
আয়োজক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নৌকাবাইচ আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা মধ্যস্থতা করেন। পরে উভয় পক্ষের সমঝোতায় পূর্বনির্ধারিত দিনেই প্রতিযোগিতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়।
লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সুনাই নদীতে বাহাদুরপুর গাংপার যুব সমাজের উদ্যোগে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এ বছর নৌকাবাইচ আয়োজনের সুযোগ চেয়েছে আয়োজক সংগঠন। তবে আগামী বছর থেকে সুনাই নদীতে আর নৌকাবাইচ আয়োজন করবে না তারা। উভয় পক্ষ এ সিদ্ধান্তে মত দেওয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে।’









