সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
ভারতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিছু ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিশ্লেষকেরা, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে দাবি করেছেন এক লেখক বিবেক ওয়াধওয়া। তার মতে, ভারত সফরে সরেজমিনে দেখা পরিস্থিতির সঙ্গে পশ্চিমা গণমাধ্যমে তুলে ধরা চিত্রের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
বিবেক ওয়াধওয়া হলেন একজন বিখ্যাত ভারতীয়-আমেরিকান প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং ফিউচারিস্ট।

লেখক জানান, গত ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ তিনি লিখেছিলেন, যানজট ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। এ মন্তব্যের পর তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। পরে ১৬ অক্টোবরের ‘তিরঙ্গা’ বিক্ষোভেও প্রত্যাশিত অভ্যুত্থান না ঘটায় তার পর্যবেক্ষণ আরো জোরালো হয়।
প্রায় তিন সপ্তাহের ভারত সফরে লেখক দিল্লির আইআইটি ও খড়গপুরের আইআইটিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ছাড়া রাস্তাঘাট, বাজার ও ছাত্রাবাসেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
বিবেক ওয়াধওয়া জানান, তার সঙ্গে কথা বলা মানুষেরা বিক্ষোভের চেয়ে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও যানজট নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী বিক্ষোভের কথা জানলেও এর মূল দাবিগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি।
তাদের কথাবার্তায় সরকার উৎখাতের কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি। লেখকের মতে, ভারতে সরেজমিন দেখা বাস্তবতা এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচারিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
তার পর্যবেক্ষণ, বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক পূর্বাভাসকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্টসহ পশ্চিমা গণমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনে ভারতের সরকারের সামনে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।
বৃহত্তর পশ্চিমা গণমাধ্যমেও ভারতকে সম্ভাব্য বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা হচ্ছিল।
তবে ১৬ অক্টোবরের ‘তিরঙ্গা মার্চ’ থেকে প্রত্যাশিত গণ-অভ্যুত্থান দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও, এসব পূর্বাভাসের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে একই ধরনের বক্তব্য আরো জোরালোভাবে প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন লেখক।
বিবেক ওয়াধওয়ার মতে, সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তার তথ্য ও প্রমাণ যাচাই করা। কোনো দাবি আকর্ষণীয় হলেই তা সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু এসব প্রতিবেদনে তথ্য যাচাইয়ের যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায়নি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরো জানান, ২০২২ সালে কাশ্মীর সফরের আগে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে সময় তার সন্তানেরা তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সফর না করার পরামর্শ দিয়েছিল। তারা দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের কয়েকটি প্রতিবেদনও পাঠিয়েছিল, যেখানে কাশ্মীরের মানুষের দুর্দশা, ভয় ও অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
এমনকি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আর্থিক সংকটের কারণে কাশ্মীরের হাউসবোটের মালিকেরা সেগুলো মেরামত করতে পারছেন না, ফলে নৌযানগুলো ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। লেখকের বক্তব্য, গণমাধ্যমের এমন চিত্রায়ণ গ্রহণের আগে সরেজমিনের বাস্তবতা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা জরুরি।
বিবেক ওয়াধওয়া জানান, ২০২২ সালে কাশ্মীর সফরে গিয়ে তিনি স্থানীয় গাইডের সঙ্গে দুর্গম পথে ঘুরেছেন, যাযাবর পরিবারগুলোর সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। শ্রীনগরে অবস্থানকালে তিনি দেখেছেন, হাউসবোটগুলো ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পর্যটকে ভরা।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছিল দীর্ঘ লাইন, আর রেস্তোরাঁগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। তার মতে, এসব দৃশ্য কাশ্মীরের অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলেনি।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ফরেন পলিসি ও ফরচুন-এর সম্পাদকদের কাছে একটি লেখা পাঠান। তবে কোনো প্রকাশনাই লেখাটি ছাপেনি। তার দাবি, দুজন সম্পাদক ব্যক্তিগতভাবে তাকে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি না থাকায় লেখাটি প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরে হিন্দুস্তান টাইমস তার লেখাটি প্রকাশ করে।
ওয়াধওয়ার অভিযোগ, কাশ্মীর নিয়ে ভুল তথ্য প্রকাশের জন্য দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পরে কোনো দুঃখ প্রকাশ করেনি বা সংশোধনী দেয়নি। এ অভিজ্ঞতার পর থেকে তিনি এসব গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রেও গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। তার লেখায় উদ্ধৃত ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের গণমাধ্যমের ওপর খুব কম বা কোনো আস্থা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিছু ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের ভারত সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সমালোচনা করেছেন এক লেখক। তার মতে, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার কারণে তাদের অনেকের ভারত সম্পর্কে বর্তমান বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির ভিত্তিতে তারা বর্তমান ভারতকে বিচার করছেন, যদিও গত কয়েক দশকে দেশটির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে।
বিবেক ওয়াধওয়ার মতে, প্রবাসী ভারতীয়দের একটি অংশ এখনো ভারতের দারিদ্র্য, পুরোনো লাইসেন্স ব্যবস্থা ও সীমিত টেলিভিশন সুবিধার সময়কার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশটিকে মূল্যায়ন করেন। অথচ সেই সময়ের পর ভারত অনেক বদলে গেছে।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার পরও কিছু প্রবাসী ভারতীয় দূর থেকে দেশটির গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সংবিধান নিয়ে পরামর্শ দেন। কিন্তু তাদের দেওয়া পরামর্শের বাস্তব পরিণতি তাদের নিজেদের ভোগ করতে হয় না। বিবেক ওয়াধওয়া বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে না বুঝে দূর থেকে মন্তব্য করাকে যথাযথ বিশ্লেষণ বলা যায় না।’
ভারতে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণও আছে। গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে, তবে এসব সমস্যার সমাধান ভারতীয়দেরই করতে হবে। বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের ভারতের রাজনৈতিক অভিভাবক হওয়ার অধিকার নেই।
লেখকের মতে, ভারতের প্রতিটি প্রতিবাদকে এমনভাবে তুলে ধরা উচিত নয়, যেন দেশটি বিপ্লবের অপেক্ষায় রয়েছে। ভারতীয়রা নিজেদের সরকারের সমালোচনা করতে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্ক করতে সক্ষম। ভারত ফ্রান্স বা বাংলাদেশের মতো নয়, দেশটির নিজস্ব ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে।
বিবেক ওয়াধওয়া আরো বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার ভারতীয়দেরই। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম বা প্রবাসী বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তন দাবি করতে পারেন না।
তিনি বলেন, প্রবাসী ভারতীয়রা যদি সত্যিই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান, তাহলে তাদের উচিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো, বিনিয়োগ করা, ভারতে ভ্রমণ করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করা।
তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান ‘ভায়োনিক্স বায়োসায়েন্সেস’-এর মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বকে দেওয়ার মতো ভারতের অনেক কিছু রয়েছে। তাই দেশটির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। দূরে বসে ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তন বা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখার চেয়ে দেশের উন্নয়নে বাস্তব অবদান রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।









