ধর্ম

অপ্রত্যাশিত রিজিক লাভে করণীয়

নিউজ ডেস্ক৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

মানুষের জীবনের অন্যতম বড় চিন্তা রিজিক। কিভাবে সংসার চলবে, কিভাবে প্রয়োজন পূরণ হবে, ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব ভাবনা অনেক সময় মানুষের হৃদয়ে অস্থিরতা তৈরি করে।

অথচ একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, রিজিকের প্রকৃত মালিক মানুষ নয়; মহান আল্লাহ। তিনি যাকে যতটুকু রিজিক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কোনো শক্তিই আটকে রাখতে পারে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে। ইসলাম একদিকে যেমন আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করতে শিক্ষা দিয়েছে, অন্যদিকে হালাল উপায়ে রিজিকের সন্ধানে সর্বাত্মক চেষ্টা করতেও নির্দেশ দিয়েছে।

এই দুইয়ের সুন্দর সমন্বয়ই একজন মুমিনের জীবনের ভারসাম্য। মানুষের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু—খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, সম্পদ ও অন্যান্য কল্যাণ—আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৮)
তাকওয়া খুলে দেয় অপ্রত্যাশিত রিজিকের দরজা

রিজিক বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো তাকওয়া—আল্লাহকে ভয় করে তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)
এই আয়াত মুমিনের জন্য এক গভীর আশ্বাস। রিজিকের সংকট যখন মানুষের কাছে সব পথ বন্ধ করে দেয়, তখন তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ এমন দরজা খুলে দিতে পারেন, যার কথা মানুষ কখনো চিন্তাও করেনি। তাই রিজিকের সন্ধানে শুধু আয় বাড়ানোর হিসাব নয়; নিজের তাকওয়া বাড়ানোর হিসাবও জরুরি।

তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়

আল্লাহর ওপর ভরসা করা বা তাওয়াক্কুল করা রিজিকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু তাওয়াক্কুল কখনো কর্মবিমুখতার নাম নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দেন; তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)
একটা পাখি বাসায় বসে থেকে রিজিকের অপেক্ষা করে না। সে সকালে বাসা থেকে বের হয়, খাবারের সন্ধান করে এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসে। অতএব, তাওয়াক্কুল অন্তরের আমল, আর রিজিকের সন্ধানে চেষ্টা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। একজন মুমিনের জীবনে দুটিই থাকা প্রয়োজন।

দোয়া ও ইস্তিগফার-রিজিকের বরকত বয়ে আনে

রিজিকের দরজা খুলে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো দোয়া। বান্দা যখন নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে আল্লাহর কাছে চায়, তখন সে মূলত তার প্রকৃত রবের কাছেই ফিরে যায়। একই সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করাও রিজিকের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদী-নালা সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০-১২)

অতএব, রিজিকের সংকটে শুধু পার্থিব হিসাব-নিকাশ নয়, নিজের গুনাহের দিকে ফিরে তাকানোও প্রয়োজন। হয়তো ইস্তিগফার ও তওবার মাধ্যমেই আল্লাহ আমাদের জন্য কল্যাণের নতুন দরজা খুলে দেবেন।

আত্মীয়তার সম্পর্ক রিজিকে বরকত আনে

ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাধ্যমে রিজিকের বরকত অর্জনের শিক্ষা দেয়নি; মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)

আজকের সমাজে স্বার্থের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অথচ একজন মুমিনের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং বরকত লাভেরও একটি মাধ্যম।

দান করলে সম্পদ কমে না

অনেকেই মনে করেন, হাতে থাকা অর্থ থেকে দান করলে সম্পদ কমে যাবে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার প্রতিদান দেবেন।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)

অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা অর্থ বাহ্যিক হিসাবে কমে গেলেও তার বরকত ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে। কখনো তা দুনিয়ায় অন্য রূপে ফিরে আসে, আর আখিরাতে রয়েছে তার জন্য মহাপুরস্কার।

সকালের শুরুতে রিজিকের সন্ধান

রিজিকের ক্ষেত্রে অলসতা ও বিলম্বের পরিবর্তে কর্মচাঞ্চল্য ও সময়ের সদ্ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের সকালবেলার কাজে বরকতের জন্য দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের সকালবেলায় বরকত দান করুন।’ সুতরাং দিনের শুরুতেই হালাল রিজিকের সন্ধানে বের হওয়া, দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা এবং সময়কে কাজে লাগানো একজন মুমিনের জন্য কল্যাণকর অভ্যাস।

হারাম পথে অর্জিত সম্পদে কোনো বরকত নেই

রিজিকের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেও একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সতর্কতা হওয়া উচিত—রিজিক যেন হালাল হয়। হারাম উপায়ে উপার্জিত অর্থ যত বেশি হোক, তাতে প্রকৃত বরকত নেই। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, আত্মসাৎ, জালিয়াতি, অন্যের অধিকার নষ্ট করা কিংবা অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিতে পারে; কিন্তু তা মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)

তাই রিজিক শুধু ব্যাংক-ব্যালেন্সের নাম নয়। সুস্থতা রিজিক, শান্তি রিজিক, নেক সন্তান রিজিক, ভালো পরিবার রিজিক, ঈমান রিজিক, ইলম রিজিক এবং আল্লাহর আনুগত্যের তাওফিকও রিজিক। তাই রিজিকের সন্ধানে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে জরুরি।