জাতীয়

বাজারে মানহীন পণ্য চেনার উপায়, নজরদারিতে সীমাবদ্ধতা

নিউজ ডেস্ক১ সেপ্টেম্বর ২০২৬৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

দেশের বাজারে মানহীন, ভেজাল, নকল ও অনুমোদনহীন পণ্যের উপস্থিতি নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় মসলা, ঘিসহ কয়েকটি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। একই সঙ্গে এসব পণ্য না কিনতে ভোক্তাদের সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

এর আগেও গত জুলাইয়ে মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে না পারায় চার প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ও প্রসাধনীসহ আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

বাজার তদারকির অংশ হিসেবে নিয়মিত বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য সংগ্রহ করে নিজস্ব পরীক্ষাগারে মান যাচাই করে বিএসটিআই। পাশাপাশি নকল, অনুমোদনহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও লাইসেন্সবিহীন পণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ ভোক্তা কীভাবে বুঝবেন কোনো পণ্য মানসম্মত কি না? আর বিএসটিআই কোনো পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার পর সেটি সত্যিই বাজার থেকে সরানো হয়েছে কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?

কিউআর কোডে মিলবে পণ্যের তথ্য

বাংলাদেশে প্যাকেটজাত ১২১টি খাদ্যপণ্যের মান তদারকির দায়িত্ব রয়েছে বিএসটিআইয়ের। অন্যদিকে সব ধরনের খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের মতে, প্যাকেটজাত পণ্য আসল কি না তা যাচাইয়ের একটি সহজ উপায় হলো প্যাকেটের কিউআর কোড স্ক্যান করা।

তিনি বলেন, প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে কিউআর কোড থাকে। সেটি মোবাইলে স্ক্যান করলেই বোঝা যাবে।

তার মতে, তুলনামূলকভাবে বড় সুপারশপগুলো নিয়ম মেনে পণ্য সংগ্রহ করায় সেখানে আসল পণ্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তিনি বলেন, অথেনটিক জিনিস পেতে হলে আমার সাজেশান হলো সাধারণত সুপার শপগুলো অথেনটিক পণ্য কেনার প্রকিউরমেন্ট করে থাকে। কিন্তুই যত গ্রামের দিকে যাবেন ততই তারা সাব-স্ট্যান্ডার্ড প্রডাক্ট দেয়।

বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হকও কিউআর কোড ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, আসল পণ্যের কিউআর কোড স্ক্যান করলে পণ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে। নকল পণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।

প্যাকেটের তথ্যও যাচাই করুন

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, প্যাকেটজাত খাদ্যের মোড়কে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক। পণ্যের নাম, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা, পরিমাণ বা ওজন, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ব্যবহৃত উপাদানের তথ্য প্যাকেটে উল্লেখ থাকতে হয়।

বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, প্যাকেজিং ল-এর মধ্যে আছে আইটেমটার নাম কী, কারা উৎপাদন করেছে তাদের ঠিকানা কী, কতটুকু ওজন, কবে উৎপাদন হয়েছে, মেয়াদ শেষে তারিখ কবে, কী কী উপাদান দেয়া হয়েছে খাবার তৈরিতে, প্যাকেটজাত খাদ্যে এই তথ্যগুলো থাকা বাধ্যতামূলক। যদি না থাকে তাহলে বুঝতে হবে সামথিং রং।

পণ্যের মোড়কের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন পেতে প্যাকেটজাত খাদ্যের যথাযথ প্যাকেজিং থাকা প্রয়োজন। বাতাস ঢোকে এমন খোলা বা ত্রুটিপূর্ণ প্যাকেটে খাদ্য বাজারজাত করার অনুমোদন দেওয়া হয় না।

কাজী ইমদাদুল হক বলেন, প্যাকেটের ধরন এয়ারটাইট বা বায়ু নিরোধক প্যাকেট হতে হবে। কোন ধরনের লুজ প্যাকেট মানে সেটির ভেতরে বাতাস ঢুকে খাবার ড্যাম হয়ে যাচ্ছে। মানে কি প্যাকেজিং হয়নি, এগুলোকে বিএসটিআই অনুমোদন দেয় না।

মানহীন পণ্য শনাক্ত হলে কী হয়?

কোনো পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান পূরণ করে লাইসেন্স নিতে হয়। পরীক্ষায় মানদণ্ড পূরণ করলেই প্রতিষ্ঠানকে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের অনুমতি দেওয়া হয়।

তবে লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য নির্ধারিত মান থেকে বিচ্যুত হলে বিএসটিআই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারে এবং বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে পারে।

এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পায়। তারা পণ্যের মান সংশোধন করে পুনরায় পরীক্ষার জন্য বিএসটিআইয়ের কাছে আবেদনও করতে পারে। তখন সংস্থাটি আবার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। পণ্য নির্ধারিত মানে উত্তীর্ণ হলে সেটি পুনরায় বাজারজাতের সুযোগ পেতে পারে।

তবে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার পরও কোনো দোকানে সেই পণ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী অভিযানে দোকান মালিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক।

তার মতে, পণ্য প্রত্যাহারের বিষয়ে বিএসটিআইয়ের বিজ্ঞপ্তি, প্রচারণা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ভোক্তাদের সতর্ক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সারা দেশে নজরদারিতে রয়েছে সীমাবদ্ধতা

দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৩টিতে বিএসটিআইয়ের কার্যালয় রয়েছে। ফলে জনবল সংকটের কারণে সারা দেশে একই মাত্রায় নজরদারি চালানো কঠিন বলে স্বীকার করেছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক।

তিনি বলেন, কোনো দোকানে আছে, কোথায় আছে ….বাংলাদেশ তো বিরাট একটা ব্যাপার। সব খুঁজে দেখা কঠিন একটা ইস্যু। আমাদের ম্যানপাওয়ারের একটা ব্যাপার তো আছেই।

লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেআইনি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারখানা সিলগালা, জরিমানা ও মামলা করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

নিয়মিত অভিযান, তবু কমছে না সমস্যা

মানহীন, ভেজাল ও নকল পণ্য শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআইয়ের পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও কাজ করে। এসব সংস্থা বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করে।

বিএসটিআইয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, নিম্নমানের, নকল, অনুমোদনহীন, লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে জরিমানা, পণ্য জব্দ এবং কারখানা সিলগালার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালে বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষায় প্রথম দফায় ৩১৩টি পণ্যের মধ্যে ৫২টিকে নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে কয়েকটি পণ্য পুনরায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় আরও ৯৩টি পণ্য পরীক্ষা করে ২২টির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ওই বছর ৭০টির বেশি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালেও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৪৩টি পণ্যের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে এমন কোন পণ্য নাই যেটা নিম্নমানের, ভেজাল বা নকল হয় না। কসমেটিকস হোক, খাবার হোক, প্রতিটা জিনিসই ভেজাল, নকল হয়। ভোক্তাদের এ বিষয়ে সচেতন করতে ক্যাব কাজ করে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে নকলের চেয়ে নিম্নমানের পণ্য তৈরির ঘটনা বেশি। অন্যদিকে প্রসাধনী, শিশু খাদ্য, টয়লেট্রিজ ও ইলেকট্রনিক পণ্যে নকলের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

ভোক্তা সচেতনতায় জোর

ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ক্যাবের সভাপতি মনে করেন, আইন প্রয়োগ ও কঠোর নজরদারির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালকও জনবল সংকটের কারণে দেশজুড়ে নিবিড় নজরদারির সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। এ কারণে বর্তমানে ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

তাই পণ্য কেনার সময় কিউআর কোড, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ, উপাদান, ওজন এবং প্যাকেটের মান যাচাই করে কেনাকাটা করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা