জাতীয়

ম্যাডাম আর নেই, কিন্তু তার শিক্ষা আমাদের বুকেই রয়ে গেল’

নিউজ ডেস্ক৩০ আগস্ট ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

‘ম্যাডাম আমাদের খুব ভালোবাসতেন। স্কুলে না গেলে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতেন।

বলতেন—মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, বৃত্তি পেতে হবে। আজ ম্যাডাম আর নেই… কিন্তু তার শেখানো শিক্ষা আর ভালোবাসা আমাদের বুকেই রয়ে গেল।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার। প্রিয় প্রধান শিক্ষিকার নিথর মুখটি শেষবারের মতো দেখতে বিদ্যালয়ে এসেছে সে।

কিন্তু চোখের অশ্রু যে কিছুতেই থামতে চায় না।
সামিয়ার পাশে থমকে দাঁড়িয়ে সহপাঠী মাহফুজা আক্তার। তার হাতে প্রধান শিক্ষিকার আঁকা একটি ছবি। ছবিটি বুকের ভেতরে আঁকড়ে ধরে সে বলে, ‘ম্যাম আমাদের কত খেয়াল রাখতেন! ঠিকমতো খেয়েছি কি না, খোঁজ নিতেন।

আজ ম্যাডাম নেই… শুধু তার আঁকা ছবি আর স্মৃতিগুলোই আমাদের কাছে রয়ে গেল।’

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রবিবার (৩০ আগস্ট) সকাল থেকেই নেমে আসে গভীর নীরবতা ও শোকে নিমজ্জিত এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। প্রিয় প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনকে শেষ বিদায় জানাতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হয় শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী ও স্থানীয় মানুষ।

চোখের চিকিৎসা নিতে গিয়ে ঢাকায় ছিনতাইকারীর নির্মমতায় প্রাণহানি

৫৭ বছর বয়সী রনজিলা পারভীন বগুড়া শহরের রহমাননগরে বসবাস করতেন। দীর্ঘ ৩০-৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি ছিলেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত প্রিয় ও মমতাময়ী এক রূপকার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। শনিবার ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে ফার্মগেটের ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশে রিকশায় ওঠেন এই দম্পতি।

সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তার হাতব্যাগ ধরে সজোরে টান দেয়। ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুর টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে শক্ত পিচঢালা রাস্তায় পড়ে যান রনজিলা পারভীন। মাথায় পান গুরুতর আঘাত। রক্তে ভেসে যায় পথ।

পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

‘আর মাত্র ৩০-৪০ সেকেন্ড পরেই হাসপাতালে পৌঁছাতাম…’

স্ত্রীর এমন বিভীষিকাময় মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্বামী আব্দুল মতিন। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসে তার কণ্ঠ, ‘আমরা তো প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিলাম… আর হয়তো ৩০ বা ৪০ সেকেন্ড লাগতো হাসপাতালে পৌঁছাতে। তার আগেই দানবের মতো এসে মোটরসাইকেলের ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দিল।’

হাহাকার ভরা গলায় তিনি বলেন, ‘চলন্ত রিকশার ধাক্কায় সে ছিটকে পড়ে প্রায় ১০ হাত দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। দীর্ঘ বছর ধরে শিক্ষকতা করা একটা মানুষ সামান্য চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে, এটা কোন বিবেক মেনে নিতে পারে?’

মায়ের স্মৃতিকাতরতায় দিশেহারা মেয়ে, সুবিচারের ব্যাকুল আকুতি

রনজিলা পারভীনের এই অকালমৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গেছে তার পরিবার। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছে মেয়ে রাইসা আক্তার। ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী এখন মাকে হারিয়ে শোকে যেন পাথর। অশ্রুসজল চোখে সে বলে, ‘আম্মু দেড় মাস ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। ২১ দিন আগে ঢাকায় ডাক্তার দেখিয়ে আবার ফলোআপের জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু ছিনতাইকারীরা সব শেষ করে দিল… আমাদের সব কেড়ে নিল।’

মায়ের ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে রাইসা আকুতি জানায়, ‘আমি সরকারের কাছে বিচার চাই। যেন আর কোনো সন্তানকে এভাবে অকালে মায়ের বুক খালি হতে না হয়।’

নিজের খরচে অসচ্ছলদের আলো দেখাতেন যিনি

১৯৮৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে আলো ছড়ানোর যাত্রা শুরু করেছিলেন রনজিলা পারভীন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, দরদি হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের দিকে। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পোশাক ও পড়ালেখার খরচ জোগাতেন তিনি।

বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও নাটোরের বনপাড়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. মোতাহার হোসেন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘ম্যাডাম আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। তার মতো একজন মানবিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব মানুষ সমাজে বিরল। এটি কেবল ছিনতাই নয়, স্পষ্ট একটি হত্যাকাণ্ড। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত কঠিন বিচার চাই।’

‘আমাদের ছাদটাই যেন ধসে গেল’

সহকারী শিক্ষক মেহেনাজ আফরিন বলেন, ‘আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এক বটবৃক্ষ। প্রতিদিন সকাল ৮টা-৯টার আগেই স্কুলে এসে বাচ্চাদের ভালোবাসতেন। আজ আমরা সত্যিই অভিভাবকহীন হয়ে পড়লাম।’

আরেক সহকারী শিক্ষক মোছা. মেরিনা খাতুন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বৃহস্পতিবারই তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে তিনি সহজে ছুটি নিতে চাইতেন না। সকালেই এসে নিজে স্কুলের তালা খুলতেন। সেই চিরচেনা হাসি আর দায়িত্ববোধের স্মৃতিগুলো এখন বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে।’

গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, রনজিলা পারভীন ছিলেন একজন অত্যন্ত আদর্শবান শিক্ষক। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে চরম শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

শ্রদ্ধা ও অশ্রুতে শেষ বিদায়

রবিবার জোহরের নামাজ শেষে বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রনজিলা পারভীনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অশ্রুসজল নয়নে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানায় তার প্রিয় শিক্ষার্থীরা।

এরপর আসরের নামাজ শেষে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে শ্বশুরবাড়ি দারাইল এলাকার তরফসরতাজ পারিবারিক কবরস্থানে পরম মমতায় তাকে দাফন করা হয়।

বিদ্যালয়ের মেহগনি গাছের পাতা থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ—সবখানেই এখন হাহাকার। শিক্ষার্থীরা নীরবে কেঁদে চলেছে, আর বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরে রাখছে তাদের প্রিয় ‘ম্যাডাম’-এর স্মৃতিময় দিনগুলো।