জাতীয়

জাহাজভাঙা শিল্পে দশ বছরে ১০৪ মৃ* ত্যু

নিউজ ডেস্ক১৬ আগস্ট ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙা শিল্পে একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটছে। গত ১০ বছরে দুর্ঘটনায় ১০৪ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

আহত হয়েছেন আরো কয়েক শ।
শুধু শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ওই এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে মারা গেছেন নয় শ্রমিক। জাহাজভাঙা শিল্পের ৬৬ বছরের ইতিহাসে একদিনে এত শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম বলে খবরের কাগজ প্রকাশ করে।

ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, গত ১০ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১০৪ শ্রমিক মারা গেছেন।

একই সময়ে আহত হয়েছেন কয়েক শ শ্রমিক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ৫০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় নয়জন মারা যাওয়ায় চলতি বছর দুই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২।

শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীতে নিহতরা হলেন, মো. রানা (২৫), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), দুই সহোদর মনসুর উদ্দিন (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮), হাবিবুর রহমান (৫০) এবং মতিউর রহমান (২০)।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাতে মতিউর রহমান নামের এক শ্রমিককে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে সাতজন চিকিৎসাধীন থাকার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মোট নয়জন মারা গেছেন।’

ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলএনজি পরিবহনকারী এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে।

ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল ছিল।’

জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ‘শ্রমিকরা এখনো চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি এ খাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। নিয়মের চেয়ে বেশি সময় কাজ করানো হলেও উপযুক্ত মজুরি দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইনও মানা হয় না। নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলোর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না।’

শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিই নয়, মালিকপক্ষের অবহেলার অভিযোগও রয়েছে। ১৫ জুলাই সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে শ্রম আদালতে মামলা করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘শিপইয়ার্ডে গিয়ে তাদের কর্মকর্তারা কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান। এরপর গত ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে নোটিশ দেওয়া হয়। এতে কোনো কাজ না হওয়ায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। তার মতে, এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট।’

 

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ‘দেশে বর্তমানে ৩০টি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড রয়েছে। আরো ৩৫ থেকে ৪০টি ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। একটি গ্রিন শিপ ইয়ার্ড গড়ে তুলতে কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।’

বিলসের কো-অর্ডিনেটর ও শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, ‘জাহাজভাঙা কারখানার মালিকরা স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনতে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেন। ঋণ পরিশোধের চাপ থাকায় ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাহাজ কাটার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ঠিকাদাররা দ্রুত কাজ শেষ করতে শ্রমিকদের বিশ্রাম ছাড়াই কাজ করান। সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি ও দ্রুত কাজ করার চাপ থেকেই প্রাণহানি ও অঙ্গহানির ঘটনা ঘটে। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫০ শ্রমিক মারা গেছেন।’

বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের সূচনা ১৯৬০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে আটকে পড়া একটি জাহাজ কাটার মাধ্যমে। পরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জাহাজ ‘আল আব্বাস’ কাটা হয়। ১৯৭৪ সালের দিকে কর্ণফুলী মেটাল ওয়ার্কস বাণিজ্যিকভাবে জাহাজভাঙার কাজ শুরু করে। এরপর সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠে দেশের প্রথম ও একমাত্র জাহাজভাঙা শিল্পাঞ্চল। দীর্ঘ ৬৬ বছর পরও এই শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।