আন্তর্জাতিক

মার্কিন চাপের মধ্যেও হরমুজে লুকোচুরি, দ্বিধায় ক্রেতারা

নিউজ ডেস্ক১৫ এপ্রিল ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ একটি অস্বচ্ছ পর্যায়ে রয়েছে। সরাসরি নৌ সংঘর্ষের পরিবর্তে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে অন্যভাবে। তা হলো, অনেক ক্রেতা এখন দ্বিধায় পড়ছে এবং জাহাজগুলো নানা কৌশলে নিজেদের গন্তব্যে লুকিয়ে চলাচল করছে।

গত ১৩ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে অবরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, কোনো জাহাজই অবরোধ ভাঙতে পারেনি।

৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ মেনে ঘুরে গিয়ে ওমান উপসাগরের একটি ইরানি বন্দরে ফিরে গেছে।
তবে জাহাজ চলাচলের তথ্য, স্যাটেলাইট ছবি এবং সংশ্লিষ্ট খাতের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, আসল প্রতিযোগিতা হয়তো আরো নীরবে চলতে আছে। সামুদ্রিক বিশ্লেষকরা হরমুজ প্রণালির কাছে ট্যাংকারগুলোর আচরণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করেছেন।

অবরোধ শুরু হওয়ার পরপরই কিছু জাহাজ তাদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।

জি-ক্যাপ্টেনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মাইক শুলার এক্স-এ লিখেছেন, ‘ট্যাংকারগুলো হয়তো ইতিমধ্যেই হরমুজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।’
তিনি এআইএস ডেটার উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেন, ‘মার্কিন অবরোধ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুটি জাহাজ তাদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।’ অন্য জাহাজগুলো আরো সৃজনশীল উপায়ে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানিয়েছে, তারা খারগ দ্বীপ থেকে একটি ট্যাংকারকে যাত্রা করতে দেখেছে, যেটি তার এআইএস সংকেতকে এমনভাবে বিকৃত করছিল যেনো, মনে হয় সেটি সৌদি আরব ছেড়েছে।

এআইএস বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম একটি জাহাজের পরিচয়, অবস্থান এবং গতিপথ দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই সংকেতগুলোকে প্রভাবিত করার কৌশলটি তথাকথিত ‘ডার্ক ফ্লিট’ কার্যক্রমের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে, যা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজগুলোকে তাদের উৎস গোপন করতে এবং নজরদারি এড়াতে সাহায্য করে। অন্য জাহাজগুলোও নতুন নতুন কৌশলে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।

ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানায়, তারা খারগ দ্বীপ থেকে একটি তেলবাহী জাহাজকে বের হতে দেখেছে। তারা তাদের অবস্থানের সংকেত এমনভাবে বদলাচ্ছিল, যেন মনে হয় এটি সৌদি আরব থেকে এসেছে।

এআইএস (অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম) সাধারণত জাহাজের পরিচয়, অবস্থান ও চলার পথ জানাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখন অনেক জাহাজ এই সংকেত পরিবর্তন করে। এ ধরনের কৌশল ‘ডার্ক ফ্লিট’ নামে পরিচিত। যেখানে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজগুলো তাদের আসল অবস্থান লুকিয়ে নজরদারি এড়িয়ে চলে।
ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ‘ডার্ক ফ্লিটের ট্যাংকারগুলো প্রায়ই তাদের নাম ও পতাকা বদলে ফেলে।’ তাই সাংবাদিকদের জাহাজ শনাক্ত করতে আইএমও নম্বর ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি বেশি নির্ভরযোগ্য। সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, অবরোধের শুরুতে বড় ধরনের দৃশ্যমান বাধার চেয়ে সমুদ্রে লুকোচুরি খেলা বেশি চলছে। ট্যাংকারগুলো নজরদারি এড়ানো ও নিয়ম মানার সীমা কতটা পর্যন্ত টানা যায়, তা পরীক্ষা করে দেখছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি চীনা মালিকানাধীন ট্যাংকার ‘রিচ স্টারি’ অবরোধ চলাকালীন সময়ে মুরলিকিশান এবং পিস গালফসহ অন্যান্য জাহাজের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।

ট্যাংকারট্র্যাকার্সের মতে, ‘রিচ স্টারি’ এমন একটি জাহাজ, যা নিয়মিতভাবে এআইএস সংকেত ব্যবহার করে এবং নিষেধাজ্ঞা ভাঙার জন্য পরিচিত। এর আগে এটি ইরানের পরিশোধিত তেল পরিবহন করেছে। তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ওমান উপসাগরে পৌঁছে আবার ফিরে যায়। আর কিছু জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঢোকার পর পুরোপুরি এআইএস সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়, যাতে তাদের অবস্থান ধরা না যায়।

ট্যাংকারট্র্যাকার্সের মতে, ‘রিচ স্টারি’ জাহাজ নিয়মিত এআইএস সংকেত ব্যবহার করে এবং নিষেধাজ্ঞা ভাঙার জন্য সুপরিচিত। আগে এটি ইরানের তেলজাত পণ্য বহন করেছে। তথ্য বলছে, জাহাজটি ওমান উপসাগরে গিয়ে আবার ফিরে আসে। আর কিছু জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঢোকার পর সম্পূর্ণভাবে এআইএস সংকেত বন্ধ করে দেয়, যাতে তাদের অবস্থান ধরা না যায়।

ওয়াশিংটন বলছে, তারা ইরানের বন্দরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম চলতে থাকায় বোঝা যায়, এই নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কার্যকর নয়। এটি আংশিক এবং অনেকটা বিতর্কিত। সব সময় নজরদারির ওপর নির্ভর করে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ জাহাজগুলো ট্র্যাকিং তথ্য বদলাতে পারে, পতাকা ও নাম পরিবর্তন করতে পারে।

শুধু জাহাজ চলাচলই নয়, এই অবরোধ ক্রেতাদের আচরণকেও প্রভাবিত করছে। পণ্যবাহী জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা ছাড়তে পারলেও আগ্রহী ক্রেতা খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে পারে ইরান।

ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান নীতি পরিচালক জেসন ব্রডস্কি বলেছেন, ‘এই মাসের শুরুতে তেহরান হরমুজ প্রণালির যান চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার চেষ্টা করার পর ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’

তিনি বলেন, একই জলপথে ইরানের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ইঙ্গিত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত তেহরানকে বলছে, ‘এত দ্রুত নয়, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা থেকে আপনাদের ও আপনাদের জাহাজগুলোকে বিরত রাখার ক্ষমতা আমাদের আছে।’

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এই অবরোধ ইরানের তেল বাণিজ্যের মূল অর্থনীতিকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস হবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়।

রয়্যাল নেভির সাবেক কমান্ডার টম শার্প এই অবরোধকে চাপ তৈরির একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন, যার লক্ষ্য ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। তিনি বলেন, একের পর এক অবরোধ ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর উপায় এবং এভাবে এটি একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। এর প্রভাব হঠাৎ নয়, বরং ধীরে ধীরে, কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে বাড়বে।

মার্কিন ট্রেজারির সাবেক কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকির মতে, এই অবরোধে প্রতিদিন প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এতে বোঝা যায় শুরুতে প্রভাব কম দেখা গেলেও সামনে বড় চাপ তৈরি হতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে কি না, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা গোপনে যেতে পারবে কি না। আর সেখানে পৌঁছানোর পর ক্রেতারা সেই ঝুঁকি নিতে রাজি হবে কি না।