জাতীয়

প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জ, কাল ভোট

নিউজ ডেস্ক২১ ডিসেম্বর ২০১৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

আগামীকাল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর ভোট। নারায়ণগঞ্জ সিটির বাসিন্দারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচিত করবেন তাদের নগরপিতা। এই ভোটকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই নারায়ণগঞ্জের বাতাসে এখন উত্তপ্ত।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ১৭৪টি কেন্দ্রের ১ হাজার ৩০৪টি ভোটকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে কাক্সিক্ষত এই ভোট। নাসিকে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। ভোট গ্রহণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চার হাজারের বেশি নির্বাচন কর্মকর্তা।

এ নির্বাচনে মেয়র পদে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্ধি¦তা করলেও মূল লড়াই আওয়ামী লীগের নৌকা ও বিএনপির ধানের শীষে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় উভয় দলের বিবেচনায়ই এটা মর্র্যাদার লড়াই। আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলই নিজ প্রার্থীর জয় নিয়ে আশাবাদী।

অন্যদিকে কাজী রকিবউদ্দিন আহমদের নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের বিদায় বেলার নির্বাচন হিসাবে নাসিকের ভোট শেষ ভালোর নজির স্থাপনের চ্যালেঞ্জ।

গত নির্বাচনে বিএনপি শেষ মুহূর্তে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম ওসমান ও স্বতন্ত্রপ্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মধ্যেই লড়াই হয়। এতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন আইভী। এবার সেই আইভী-ই প্রার্থী আওয়ামী লীগের।

আইভী নারায়ণগঞ্জের স্বনামধন্য রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে। আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পর দুইবার নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার মেয়ে আইভী ২০০২ সালের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি পৌরসভার দায়িত্ব পালন করেন।

অপরদিকে বিএনপির প্রার্র্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির প্রাক্তন সভাপতি, রাজনীতিতে একেবারেই নতুন। এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার আইনজীবী হিসাবে আলোচিত। দলের বাইরে এটাই তার পরিচয়ের পুঁজি।

নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু ভোট হবেতো? এমন প্রশ্ন সেখানের ভোটার ও পর্যবেক্ষকদের মনে রয়েই গেছে। এ যাবৎ ভোটের চূড়ান্ত সময় পর্যন্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালোর মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। তারপরও ভোটের দিন এই পরিবেশ কতটা বজায় থাকবে, একটা শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সুষ্ঠু ভোটে একেবারেই নিশ্চিত হতে পারছেন না ভোটাররা।

নির্বাচন নিয়ে গতকাল প্রচারণার শেষ দিনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আইভী বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) প্রচারণার শেষ দিন। আর কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ শুনব না। কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও করব না। আমিও চাই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। ভোটাররা যাতে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারে সেজন্য সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা করতে হবে। যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে সেটা এখন ভোটকেন্দ্রে গিয়েই থামবে। মানুষ এখন ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ভোটদের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট চাই।’

অপরদিকে শেষদিনের প্রচারণায় বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘মানুষ ধানের শীষে ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছে। লোকজন ধানের শীষকেই ভোটে পাস করাবে। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেই সরকার ষড়যন্ত্র করছে। যে কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বারবার সেনা মোতায়েনের দাবি জানালেও নির্বাচন কমিশন সেটি করেনি। নির্বাচনের দিন যদি কোন সহিংসতা হয় তার দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভোট নিয়ে শঙ্কায় আমি। নির্বাচনের শুরু থেকেই আমি সেনাবাহিনী মোতায়েন চেয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটা করেনি। এ কারণে সাধারণ ভোটাররাও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। আর সরকারও চাচ্ছে না সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হোক। সরকারের অবস্থান ও ভাবমূর্তি নির্বাচনের দিন সকালেই বোঝা যাবে। তারপরও আমি চাই সুষ্ঠু ভোট হোক।’

মঙ্গলবার উভয় দলের নেতারাই নিজ প্রার্থীর জয়ের প্রত্যাশা করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টুইটে সাখাওয়াত হোসেন খানের ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আগের দিনও বিবৃতিতে ভোটারদের প্রতি নীরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে ধানের শীষের প্রার্র্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।

অপরদিকে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তিন কারণে নৌকা মার্কার প্রার্থী বিজয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইলেকশন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হলে নৌকাই বিজয়ী হবে, ইনশাআল্লাহ। এখানে আমাদের তিনটি বিষয় রয়েছে তা হল আমাদের প্রার্থী জনপ্রিয়, দ্বিতীয়ত সেখানে শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের জোয়ার আছে আর আমাদের সাংগঠনিক শক্তি। এ তিনটির সমন্বয়ে নৌকার পাল্লাটাই ভারী, সেটা আমার মনে হয় সবাই স্বীকার করবে। আমাদের দল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্বাধীন ও কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে। এটাই আমরা চাই। এটাই আমাদের নেত্রীর নির্দেশ।’

নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং বিএনপির অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ছাড়াও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট মনোনীত প্রার্থীও মেয়র পদে ভোট লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। ইতিমধ্যে বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী।

২৭ ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ সিটিতে ৩৮ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও ১৫৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ৫ ডিসেম্বর দলীয় প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পর থেকে আনুষ্ঠানিক গণসংযোগে শুরু হয়। আশার কথা, তফসিল ঘোষণা থেকে গতকাল পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃংখলা বাহিনী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির প্রায় দশ হাজার সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। ভোট উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার নির্বাচনী এলাকায় সরকারি ছুটি।

গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর পুলিশ লাইনে সাংবাদিকদের সামনে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনে কেউ ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্ন করার চেষ্টা করলে আইনশৃংখলা বাহিনী গুলি ছুড়বে। যদি কোনো পুলিশ সদস্য গুলি না ছোড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইসি ও আইনশৃংখলা বাহিনীর তথ্যমতে, প্রায় ১৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বিবেচনা করে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তায় ১২জন অস্ত্রধারীসহ মোট ২৪জন নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন। পাশাপাশি সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ১০জন অস্ত্রধারীসহ ২২জন নিরাপত্তাকর্মীর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে শেষ বেলার শেষটায় নজির স্থাপন করে রেখে চান বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এই কমিশনের অধীনে নাসিক নির্বাচনই হচ্ছে শেষ মেগা নির্বাচন। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নির্বাচনী এলাকায় ইসির গোপন পর্যবেক্ষকও থাকবেন। এছাড়াও ৩২০ জন দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক থাকবেন। তবে ভোটের মাঠে সকল সমীকরণের যোগফল ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন।

 

 
সূত্র: রাইজিংবিডি