জাতীয়

নিজের বিরুদ্ধে তদন্তের দিনে শিক্ষকদের ডেকে আনার অভিযোগ শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক২ সেপ্টেম্বর ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত হয়েছে। তদন্ত চলাকালে স্কুলের ক্লাস রেখে শতাধিক শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে জড়ো হন।

তাদের মধ্যে শিক্ষা কর্মকর্তার পছন্দের ও অনুসারী শিক্ষকেরা ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দোতলায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মজিব আলম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষের বাইরে ও ভেতরে শিক্ষকদের ভিড়।

তদন্ত চলার সময় অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছাকেও কক্ষে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এ নিয়ে অভিযোগকারী পক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার সামনেই লিখিত অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য দিতে হয়েছে। এতে অনেকে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেননি।

কেউ কেউ তদন্ত কর্মকর্তার সামনে সাদা কাগজে লিখিত বক্তব্য দেন, যা অভিযুক্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই হয়েছে।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নান্দাইল উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সামনে ও ভেতরে শতাধিক শিক্ষককে অবস্থান করতে দেখা যায়। কয়েকজন শিক্ষক জানান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ফোন করে তাদের সেখানে যেতে বলা হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে তার পক্ষে কথা বলার জন্য তাদের ডাকা হয়েছিল। তবে এভাবে বিদ্যালয়ের ক্লাস চলাকালে শিক্ষকদের উপজেলা সদরে আসার কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একজন প্রধান শিক্ষক অবশ্য বলেন, মাস শেষ হওয়ায় তারা বেতন তুলতে উপজেলা সদরে এসেছিলেন। একই সঙ্গে শিক্ষা কার্যালয়েও গিয়েছেন।

নান্দাইল উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম আনজু বলেন, ‘এভাবে শিক্ষকদের দলবেঁধে আসা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। যতদূর জানতে পেরেছি, নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তকে প্রভাবিত ও আড়াল করতেই শিক্ষা কর্মকর্তা তার পছন্দের শিক্ষকদের ডেকে এনেছেন।’

শিক্ষক নেতা জাকির আহম্মেদ তুহিন বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে একটু আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাই তিনি এসেছিলেন। তবে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পরে চলে যান।

নান্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলি আক্তার, চন্ডীপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পারভিন আক্তার ও সৈয়দগাঁও চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহিদা ইয়াসমিন বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে ফোন করে তাদের যেতে বলা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে তার পক্ষে সাফাই দেওয়ার জন্য তাদের ডাকা হয়েছে। বিষয়টি বিব্রতকর মনে হওয়ায় তারা দ্রুত বিদ্যালয়ে ফিরে যান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা বলেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে—এ কথা শুনে অনেকেই সেখানে আসতে পারেন। তবে স্কুল চলাকালে শিক্ষকেরা তার নির্দেশে এসেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক না।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোনো শিক্ষকের অকারণে উপজেলা সদরে আসার সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্ত কর্মকর্তা মজিব আলম বলেন, ‘সব তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখে অধিদপ্তরে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। আমার তদন্তে যাদের প্রয়োজন, তাদের সঙ্গেই কথা বলেছি। অন্যরা কেন এসেছেন, তা আমার জানা নেই।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে গত ২৫ আগস্ট জারি করা এক অফিস বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, নান্দাইল উপজেলার নগর কচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুন্নাহার শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দ করা মেরামত ও সংস্কার খাতের অর্থ আত্মসাৎ, উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহের বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ।

এ ছাড়া উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে বিল উত্তোলন, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে শিক্ষক বদলি ও নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) লাগানোর অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে।