সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মানুষের জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন না থাকলে বড় কোনো অর্জনের পথও উন্মুক্ত হয় না। তাই স্বপ্ন বড় দেখা উচিত।
তবে ইসলামের দৃষ্টিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানে শুধুমাত্র অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা দুনিয়াবি সাফল্যের পেছনে ছুটে চলা নয়। প্রকৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষা হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে উন্নত করা, নেক আমলে অগ্রসর হওয়া, সময়ের মূল্য বোঝা এবং দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনে কল্যাণ ও উৎকর্ষ অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৮)
মানুষ সাধারণত তার আকাঙ্ক্ষার পরিধি অনুযায়ী চেষ্টা করে।

লক্ষ্য যত বড় হয়, সাধনাও তত গভীর হয়। তাই একজন মুমিনের প্রতিযোগিতা হবে ভালো কাজে, জ্ঞান অর্জনে, ইবাদতে, চরিত্রে, মানুষের কল্যাণে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘এ বিষয়েই প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল দৃঢ় সংকল্প, ধৈর্য ও অবিচল প্রচেষ্টার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মক্কার কঠিন পরিস্থিতি, নির্যাতন, অবরোধ, উপহাস ও নানা প্রতিকূলতা তাঁকে তাঁর দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছেন, ‘অতএব যখন তুমি একটি কাজ সম্পন্ন করবে, তখন অন্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত করো এবং তোমার রবের প্রতিই মনোনিবেশ করো।’ (সুরা : শারহ, আয়াত : ৭–৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরাও তাঁর কাছ থেকে এই দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও মহৎ সংকল্পের শিক্ষা নিয়েছিলেন। পরবর্তী নেককার প্রজন্মও সেই আদর্শ অনুসরণ করে জ্ঞান, ইবাদত, দাওয়াত ও মানবকল্যাণে নিজেদের জীবন ব্যয় করেছেন। তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল বড় স্বপ্ন দেখার নাম নয়।
সঠিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে থাকতে হয় প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সঠিক বিচারবোধ ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। লক্ষ্য যদি মহৎ হয় কিন্তু তার পথে কোনো পরিশ্রম না থাকে, তাহলে সেটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়—শুধু কল্পনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আমার পথে সর্বাত্মক চেষ্টা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহ দেখাব।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)
জীবন আসলে সময়ের সমষ্টি। একটি দিন চলে যাওয়া মানে জীবনের একটি অংশ চিরতরে চলে যাওয়া। হারানো অর্থ ফিরে পাওয়া যায়, হারানো সম্পদ পুনরায় অর্জন করা যায়; কিন্তু হারানো সময় কোনোভাবেই ফিরে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১১৫)
তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের আগে মূল্যবান মনে করতে বলেছেন, ‘বার্ধক্যের আগে তোমার যৌবনকে, অসুস্থতার আগে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের আগে তোমার সম্পদকে, ব্যস্ততার আগে তোমার অবসরকে এবং মৃত্যুর আগে তোমার জীবনকে।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৭৮৪৬)
তাই আজ যে সময় হাতে আছে, সেটিই আমলের সময়। ‘পরে করব’, ‘একদিন শুরু করব’—এমন দীর্ঘসূত্রিতা অনেক ভালো কাজকে চিরদিনের জন্য অসম্পূর্ণ রেখে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে অলসতা থেকে আশ্রয় চাইতেন। তিনি দোয়া করতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি…।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই…। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯৩)
তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দুনিয়া পরিত্যাগের সঙ্গে এক করে না দেখা উচিত। কেননা ইসলাম দুনিয়ার বৈধ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
তাই স্বপ্ন হোক বড়, সংকল্প হোক দৃঢ়, কর্ম হোক সৎ এবং লক্ষ্য হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি। কেননা একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্প তার নিজের জীবন বদলে দিতে পারে। আর অসংখ্য মানুষের মহৎ সংকল্প একত্রিত হলে সমাজ ও জাতির উন্নয়ন ঘটে। কোনো জাতির উন্নতি শুধু সম্পদ বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; মানুষের জ্ঞান, শ্রম, শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের মানসিকতার ওপরও তা নির্ভরশীল।









