জাতীয়

হজযাত্রীদের চরম ভোগান্তির নেপথ্যে মন্ত্রণালয়ের চরম গাফিলতি

নিউজ ডেস্ক৬ আগস্ট ২০১৭৭ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক: ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের চরম গাফিলতির কারণেই অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন এবারের হজযাত্রীরা। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে যারা হজ করেছেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত ফি হিসেবে দুই হাজার রিয়াল দিতে হবে, তা ১০ মাস আগেই সৌদি কর্তৃপক্ষ ধর্ম মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছিল; কিন্তু এটি হজ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এছাড়া একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছেলের সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে পরিচিত ৯১টি হজ এজেন্সি নির্ধারিত সময়ে হজযাত্রীদের জন্য সৌদি আরবে সার্ভিস প্রোভাইডার বা মোয়াল্লেম নিয়োগ করেনি। প্রভাব খাটিয়ে হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার ১০ দিন পর এসব এজেন্সি মোয়াল্লেম নিয়োগ দিয়েছে। সব মিলিয়ে সার্বিক হজ ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হয়েছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। হজে যেতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে এখনও শঙ্কায় আছেন প্রায় ৪০ হাজার হজযাত্রী।

এদিকে বিমান সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হজযাত্রী পরিবহন শুরুর প্রথম ১৪ দিনে যাত্রী সংকটে বাতিল হয়েছে ১৯টি ফ্লাইট। বিমানের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ২০টি অতিরিক্ত স্লটের জন্য সৌদি সিভিল এভিয়েশনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্লট অনুমোদন হয়নি।

বিমানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ২০টি স্লট অনুমোদন হলেও বিমানের পক্ষে শেষ পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৬০০ হজযাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে না। কারণ হাতে আছে মাত্র ২২ দিন। এতে বাধ্য হয়ে এ বছরও বিমানকে ৮ থেকে ১০ হাজার হজযাত্রী সাউদিয়া এয়ারলাইন্সকে ছেড়ে দিতে হবে। গত বছরও এ ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে শেষ মুহূর্তে বিমান সাড়ে ৪ হাজার হজযাত্রী সাউদিয়া এয়ারলাইন্সকে ছেড়ে দিয়েছিল। এবার যদি এ সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বিমানকে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে। কারণ হজযাত্রী পরিবহনের জন্য এ বছর বিমান চড়া দামে ৩টি এয়ারক্রাফট ভাড়া নিয়েছে। এখন স্লটের অভাবে যদি হজযাত্রী পরিবহন করতে না পারে, তাহলে একদিকে বসিয়ে বসিয়ে লিজ নেয়া উড়োজাহাজের ভাড়া গুনতে হবে, অপরদিকে হজযাত্রীর বিমান ভাড়া থেকেও বঞ্চিত হবে।

জানা গেছে, গত বছরের ৭ আগস্ট নতুন ভিসা কাঠামো অনুমোদন করে সৌদি আরব মন্ত্রিপরিষদ। সেটি কার্যকর হয় ২ অক্টোবর। নতুন নিয়মাবলিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, পুনরায় হজে গেলে দুই হাজার রিয়াল ফি দিতে হবে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে সরকারের জারি করা হজ প্যাকেজের কোথাও এ ২ হাজার রিয়ালের কথা উল্লেখ নেই। সংশ্লিষ্ট অনেকেই এখন এজন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আনছেন।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হজ অফিসের বিজনেস অটোমোশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২ অক্টোবর সৌদি ভিসা কাঠামো অনুমোদনের পর তারা ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ হজ মিশনকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, সেসব ব্যক্তি টানা দ্বিতীয়বার হজ ও ওমরা পালন করবেন, তাদের ২০১৭ সালের হজ প্যাকেজের সঙ্গে অতিরিক্ত ২০০০ রিয়াল বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ হার টাকা দিতে হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিএ(জিভি)/হজ/পিপিও/২০৩/১৬/৭২৪৩ স্মারক নম্বরের এ চিঠি গত বছরের ৭ অক্টোবর ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এসে পৌঁছে। এরপর ফাইল আকারে তা সচিব হয়ে মন্ত্রীর টেবিল পর্যন্ত যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কেউই এ চিঠির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বছর হজ প্যাকেজ ঘোষণা করার আগে তারা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এ চিঠির বরাত দিয়ে হজ প্যাকেজে ২ হাজার রিয়াল অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। কিন্তু ওই বৈঠকে মন্ত্রী ও সচিব কেউই বিষয়টি পাত্তা দেননি। একই সঙ্গে বিজনেস অটোমেশন বিভাগ থেকেও এ নিয়ে এক চিঠিতে ২০১৭ সালের হজযাত্রী প্রাক-নিবন্ধন ও নিবন্ধনের আগেই জরুরি ভিত্তিতে ২ হাজার রিয়ালের বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় ওই চিঠিরও কোনো উত্তর দেয়নি। আর এ কারণে এ বছর ১৫ থেকে ২০ হাজার হজযাত্রীর ভিসা প্রক্রিয়া থেমে গেছে। যার কারণে টিকিট কেটেও ভিসার অভাবে তারা এখনও জেদ্দা পৌঁছতে পারেননি।

জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল জলিল বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। গণমাধ্যমের খবর, তারা যদি এখনকার সিদ্ধান্ত আগের বলে চালিয়ে দিতে চায়, তবে তো আমাদের কিছু করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আগে জানলে দুই হাজার রিয়ালের বিষয়টি প্যাকেজে যুক্ত করতাম।’ বিজনেস অটোমেশনের চিঠি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো চিঠি মন্ত্রণালয়ে আসেনি।

হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাবের নেতারা বলছেন, এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ শাখা থেকে ১০ পৃষ্ঠার একটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করলেও ২ হাজার রিয়াল ফি নিয়ে কিছু বলা হয়নি। এ কারণে প্রায় ২০ হাজার হজযাত্রী যারা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বার হজ করতে যাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে হজ এজেন্সিগুলোর মতবিরোধ চলছে। হজযাত্রীদের অভিযোগ, বিষয়টি প্যাকেজে ছিল না। এটা মন্ত্রণালয় ও হজ অফিসের ব্যর্থতা। এখন বলছে, মোয়াল্লেম ফি বেড়ে গেছে ৭৫০ থেকে ১০০০ রিয়াল। বাস্তবে মোয়াল্লেম ফি ১ টাকাও বাড়েনি।

হাবের মহাসচিব শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, মোয়াল্লেম ফি বাড়ানোর তথ্যটি সঠিত নয়। তিনি বলেন, সৌদি আরবে ৩ ক্যাটাগরির মোয়াল্লেম ভাড়ায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৭০০, ১ হাজার ৫০০ ও ২ হাজার রিয়াল। বাংলাদেশের অধিকাংশ হজ এজেন্সি প্রতিবছর ৭০০ রিয়ালের মোয়াল্লেম ফি ধরে হজ যাত্রী সংগ্রহ করে। মূলত ধনী ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর হজযাত্রীরাই কেবল ১ হাজার ৫০০ ও ২ হাজার রিয়ালের মোয়াল্লেম নিতে চান।

হাব মহাসচিব বলেন, অন্যান্য বছর ৭০০ রিয়ালের জন্য যে পরিমাণ মোয়াল্লেম রাখা হতো, এ বছর এই ক্যাটাগরিতে এর সংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে দিয়ে ১ হাজার ৫০০ ও ২ হাজার রিয়ালের মোয়াল্লেমের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ কারণে ৯১টি এজেন্সি প্রায় ১৯ হাজার হজযাত্রীর জন্য ৭০০ রিয়ালের মোয়াল্লেম নিয়োগ দিতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তাদের ১ হাজার ৫০০ রিয়ালের মোয়াল্লেম নিয়োগ দিতে হয়েছে। এতে তাদের অতিরিক্ত ৭৫০ রিয়াল বেশি গেছে।

হজযাত্রীদের অভিযোগ, এই ৯১টি হজ এজেন্সি গত সপ্তাহে অর্থাৎ হজ ফ্লাইট শুরুর ১০ দিন পর তাদের ভিসার জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছে। এ কারণে তাদের ভিসা পেতেও দেরি হচ্ছে। অথচ বিমানের টিকিট সিরিয়াল অনুযায়ী তাদের এরই মধ্যে জেদ্দা পৌঁছে যাওয়ার কথা।

ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বলেছেন, ‘সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সম্প্রতি এক সভায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত এসব জটিলতা নিরসন না হলে কমপক্ষে ৪০ হাজার যাত্রীর হজ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শনিবার পর্যন্ত ১ লাখের ওপর ভিসার জন্য আবেদন জমা হয়েছে। ভিসা পাওয়া গেছে ৬৮ হাজার ৮৭৯টি। এর মধ্যে ৪৪ হাজার হজযাত্রী জেদ্দা পৌঁছেছেন। বাকিদের ভিসা থাকলেও ২ হাজার রিয়াল ও অতিরিক্ত মোয়াল্লেম ফিসহ নানা কারণে যেতে পারছেন না।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, এ বছর তাদের হজযাত্রী পরিবহনের কথা ৬৩ হাজার ৬০০ জন। এজন্য তারা ৩টি এয়ারক্রাফট ভাড়া নিয়েছে। কিন্তু শনিবার পর্যন্ত তাদের ১৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এভাবে চললে আরও ১০টি ফ্লাইট বাতিল হতে পারে। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহম্মেদ যুগান্তরকে বলেন, এভাবে যদি ফ্লাইট খালি যায়, তাহলে বিমানের পক্ষে সব যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে না। তবে তিনি বলেন, এ বছর তাদের অতিরিক্ত ১০টি স্লট নেয়া আছে।

আরও ২০টি স্লটের জন্য আবেদন করা হয়েছে। যদি আর কোনো ফ্লাইট বাতিল না হয়, তাহলে সিডিউল ফ্লাইটসহ বাকি স্লট দিয়ে সব যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। তবে এমডির এ বক্তব্য মানতে রাজি নয় খোদ মার্কেটিং বিভাগ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছর সাড়ে ৪ হাজার হজযাত্রী পরিবহন সম্ভব হয়নি। এবারের পরিস্থিতি আরও খারাপ। যদি এভাবে ফ্লাইট বাতিল হয়, তাহলে নির্ধারতি সময়ে সব যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে না। কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার হজযাত্রী সাউদিয়া এয়ারলাইন্সকে দিয়ে পরিবহন করাতে হবে। এতে বিমানকে লিজের উড়োজাহাজ ভাড়া কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হবে। সূত্র: যুগান্তর