নিজস্ব প্রতিবেদক :
পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের বিলনেপালপাড়া এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে (এএলসি) এগ্রোইকোলজি, খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি নিয়ে কমিউনিটি আলোচনা ও অ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গ্রিন কোয়ালিশন ও উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের আয়োজনে এবং কৃষাণী সুলতানা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় নিরাপদ কৃষিচর্চাকারী ৪৫ জন নারী ও পুরুষ কৃষক অংশ নেন। সভায় স্থানীয় বীজ, কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান ও স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, বীজ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তোলার বিষয়ে কৃষকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

এ সময় কৃষকেরা বিভিন্ন জাতের দেশীয় শাকসবজি ও ফসলের বীজ প্রদর্শন করেন। কৃষাণী মাহমুদা বেগম জানান, তিন বছর আগে তার কাছে মাত্র এক জাতের মিষ্টি কুমড়ার বীজ ছিল। বর্তমানে বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে তিনি পাঁচ জাতের মিষ্টি কুমড়া ও ছয় জাতের শিমের বীজ সংরক্ষণ করছেন।
এএলসি পরিচালনাকারী কৃষাণী সুলতানা বেগম বলেন, তাদের কেন্দ্রে বর্তমানে ১৯৮ জাতের দেশীয় শাকসবজি, ফসল ও ঔষধি গাছের বীজ রয়েছে। তারা নিজেরাই এসব বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিনিময় করেন। পাশাপাশি জৈব সার ও জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা নিয়েও কৃষকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়।
সভায় স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত নারী সদস্য শুকিলা বেগম বলেন, স্থানীয় বীজ ব্যবহারে সবজি ফসলে রোগ-পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম হয় এবং এসব বীজ কৃষকদের হাতের নাগালের মধ্যে থাকে। তিনি স্থানীয়ভাবে মানুষের পছন্দের বীজ সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, জিএমও ও হাইব্রিড বীজের কারণে স্থানীয় বীজের ব্যবহার ও কৃষকের অধিকার কমে যাচ্ছে। তাই স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদনে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিলনেপালপাড়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, সরকার কমিউনিটি ও ইউনিয়নভিত্তিক স্থানীয় বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে সহযোগিতা করলে বিদেশ থেকে বীজ ও সার আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় কমানো সম্ভব। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কৃষকেরাই জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক তৈরি করে ব্যবহার করতে পারেন।
সভায় অংশগ্রহণকারী কৃষকেরা কৃষিজমিতে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার ও অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। তাদের মতে, কৃষকের নিজস্ব বীজ ও স্থানীয় কৃষি জ্ঞান খাদ্য সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি।
সভায় জানানো হয়, বিলনেপালপাড়া এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার ও কমিউনিটি বীজ ব্যাংকে বর্তমানে ১৯৮ জাতের বীজ সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে ৮৩ জাতের শাকসবজি, ৪০ জাতের ধান, ৩০ জাতের ঔষধি উদ্ভিদ, ১৫ জাতের ফল ও ৩০ জাতের বিভিন্ন ফসলের বীজ রয়েছে। দর্শনপাড়া ইউনিয়নের ৩৫টি মডেল শতবাড়িতে মৌসুমভিত্তিক এসব বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত বীজ এএলসিতে জমা রেখে কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে বিনিময় করা হয়।
সভায় নারী কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত বীজ হাতে তুলে ধরে বীজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবি জানান। একই সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের অবাধ বিক্রি বন্ধ ও নিরাপদ কৃষির প্রসারের দাবি করেন তারা।
সভা থেকে স্থানীয় বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে ইউনিয়নভিত্তিক সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি, কমিউনিটি বীজ ব্যাংক সম্প্রসারণ, কৃষকের স্থানীয় জ্ঞান ও কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যার চর্চার স্বীকৃতি এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ও অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়।
সভায় বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারীসহ স্থানীয় কৃষক ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।









