রাজশাহী

রামেক হাসপাতালে সাত মাসে ২২৫৫ শিশুর মৃত্যু

নিউজ ডেস্ক৩১ মার্চ ২০২৬৭ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাত মাসে মারা গেছে দুই হাজার ২৫৫ জন শিশু। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়েছে ২৮ হাজার ৪২৭ জন। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকই রয়েছে ৫ শতাধিক। এর বাইরে মারা গেছে হাম, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত শ^াসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে। নবজাতকদের যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের বেশিরভাগই অপুষ্টি এবং অপরিপক্কতার কারণে মারা গেছে। এই নবজাতকদের মায়েদের অধিকাংশই বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করায় তাদের নবাজতকরা পুষ্টিহীন এবং অপরিপক্ক শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। যার ফরে জন্মের পর পরই এক-চার দিনের মাথায় মারা যাচ্ছে অনেক শিশু। এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে নিউমোনিয়া ও হাম রোগ। এতে আরও বেশি শিশু মারা যাচ্ছে বলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে সার্বিকভাবে রামেক আশঙ্কাজনক হারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, রামেক হাসপাতালে আশঙ্কাজনক হারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামের প্রাদুভার্ব চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় বিগত নির্দলীয় সরকারের আমলে ভ্যাকসিন কেনার যে জটিলতা তৈরী হয়েছিলো, সেই সমস্যার কারণেই হয়তোবা এই হামের প্রাদুভার্ব তৈরী হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার যারা এই ভ্যাকসিন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা গত এক দেড় বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের আন্দোলনের কারণে কিংবা ভ্যাকসিন সংকটের কারণে এই ধরনের প্রাদুভার্ব দেখা দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের অবশ্যই নজর দেওয়া উচিৎ, ভ্যাকসিনেশন এনে এই প্রোগ্রামকে কিভাবে সফল করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া। এখন দেখা যাচ্ছে, চার মাসের শিশুরাও হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নয় মাসের আগেই কেন এটির প্রাদুভার্ব হচ্ছে, সেটি গবেষণা করে সেব্যাপারে দৃষ্টি দিতে হবে।’

চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ দিতে চাই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। তারা সীমিত সামর্থ নিয়েও তারা রোগীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। চিকিৎসকরা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।’

এটি নিয়ে আতঙ্কগ্রস্থ হওয়ার কিছু নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ এ রোগ একজনের থেকে ১০-১৫ জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেটি যেন না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের সকলকে সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে। চিকিৎসকদেরকে এ ব্যাপারে কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করতে হবে।’

অপরদিকে, হামে শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় আজ মঙ্গলবার রাজশাহী হাসপাতাল পরিদর্শন করতে আসছেন স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস। তিনি হাসাপাতালের পরিচালক, স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ও সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস নিশ্চিত করেছেন, গত সাত মাসে (সেপ্টেম্বর-মার্চ) মোট দুই হাজার ২৫৫ জন শিশু চিকিৎসাধিন অবস্থায় মারা গেছে। সর্বশেষ মার্চ মাসে মারা গেছে ৩০৪ জন। এই সাত মাসে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাধীন ছিল ২৮ হাজার ৪২৭ জন শিশু। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকের সংখ্যায় বেশি।

তিনি আরও জানান, গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৭০ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৩৬ জন, অক্টোবরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৯০১ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৪ জন, নভেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ১৯৯ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৩ জন. ডিসেম্বরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৪৩ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৬১ জন, জানুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৩৫ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৭৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ২৫৭ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৯১ জন এবং মার্চের গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৫২২ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩০৪ জন।

রামেক হাসপাতালের আরেকটি সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ থেকে গতকাল দুপুর একটা পর্যন্ত এ হাসপাতালে মারা গেছে ৪১৬জন শিশু। এই ৩৬ দিনেই শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। যার মধ্যে সর্বোচ্চ শতাধিক শিশু মারা গেছে অপুষ্টি এবং অপপরিপক্কভাবে জন্ম নেওয়ায়। জন্মের এক-চার দিনের মধ্যে মারা গেছে এসব নবজাতক। হাসপাতালের ২৬ নম্বর গাইনি ওয়ার্ডে জন্ম নেওয়া এসব নবজাতক মারা গেছে। এর বাইরে হাসপাতালের ২৪, ২৭ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশু মারা গেছে আরও তিন শতাধিক। সবমিলিয়ে গড়ে এই ৩৬ দিনে এ হাসপাতালে প্রতিদিন মারা গেছে অন্তত ১১ জনের চেয়েও বেশি।

সূত্র মতে, মুর্মূর্ষু শিশুদের আইসিইউতে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করা হলেও আইসিইউ’র শয্যা সংকটের কারণে সেখানেও চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না অধিকাংশেরই বেশি। ফলে হাসপাতালের বিছানা বা বাইরে বারান্দায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে হচ্ছে সেসব শিশুদের। আইসিইউ’র সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে মারা গেছে গত এক মাসে শতাধিক।

এদিকে, গতকাল রাজশাহী হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় বিপুল পরিমাণ শিশু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় বাইরে বারান্দায় শত শত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে এ হাসপাতালে।

দেড় বছরের শিশু তাহসিনাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের শিশু বিভাগের বারান্দায় বসেছিলেন মা মীম খাতুন। তিনি জানান, ‘গত শুক্রবার তার শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে এ হাসপাতালে চিকিৎসার নিয়ে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের শয্যা না পাওয়ায় বারান্দায় শুয়ে বসে থেকে তাঁর শিশু সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। মীম বলেন, ‘বারান্দাতেও ধাপ ফেলানোর জায়গা নাই। রোগী আর মানুষের ভিড়ে এখানে চিকিৎসা করানোয় দায়। তবে চিকিৎসকরা আসছেন। তারা চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে আগের চেয়ে এখন একটু ভালো আছে আমার ছেলে।’

২৭ নম্বর শিশু ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝেতে চার মাস বয়সী সন্তান আব্দুল্লাহকে কোলে নিয়ে বসেছেলেন বাবা রায়হান আলী। তাঁর বাড়ি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায়। তিনি বলেন, ছেলের জ¦র আর শরীরে কি যেন বের হয়েছে সে কারণে তাকে নিয়ে গত শুক্রবারে অ্যাসেছি হাসপাতালে। এখনো বেড পাইনি। বারান্দায় গাদাগাদি করে বসে থ্যাকতে হচ্ছে। এতো রোগীর মধ্যে চিকিৎসা করানোয় যেন দায়।’

অন্যদিকে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজশাহী হাসপাতালটি ১২শ শয্যার হলেও ৫৫০ শয্যার জনবল নিয়ে এখানে কার্যক্রম চালাতে হয়। এখানে গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালের ভিতরে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর বর্হিবিভাগে গড়ে সাত হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় প্যাথলজি ও রেডিওলজি থেকে শুরু করে সকল প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে সীমিত জনবল দিয়েই। আমাদের এখানে রোগীর চাপ ক্রমানয়ে বাড়ছে। রাজশাহীর বাইরে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ আশে-পাশের সকল জেলা থেকে রোগী আসে। সেসব রোগীকে আমরা চিকিৎসা দেয়। এই রোগীগুলো যখন আসেন, তখন অনেকেই কিন্তু জটিল পর্যায়ে থাকে। আমরা চিকিৎসা দেয়। তার পরেও অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটি প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় সেটি প্রয়োজনের তুলনায় দিতে পারছি না। ফলে অনেকেই অপেক্ষামান থাকায় অনাকাঙ্খিতভাবে খারাপ পরিনতির শিকার হচ্ছে। তার পরেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা এই হাসপাতালের সর্বোচ্চ সেবা দিতে বদ্ধ পরিকর ও নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

অন্যদিকে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের জানান, গত জানুয়ারির পর থেকে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে একজন শিশু। আর সন্দেহজনক রোগী মারা গেছে ২৯ জন। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৭০ জন রোগী ভর্তি হয়। এর মধ্যে পরীক্ষা শেষে ৩৫ জনের শরীরে হাম রোগের উপসর্গ পাওয়া যায়। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছয়-নয় মাস পর্যন্ত বয়সী। এর মধ্যে ৬০ ভাগ আক্রান্ত হচ্ছে ছয় মাসের মধ্যে।

জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী যেমন বেড়েছে, শিশু মৃত্যুর হারও বেড়েছে। তবে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে জন্মের পর পরই। এসব নবজাতক মারা যাচ্ছে, তাদের মায়েদের অনেকেই বাল্য বিয়ের কারণে। ফলে সেসব মায়েরা অপুষ্টি ও অপরিপক্ক সন্তান জন্ম দিচ্ছে। এসব নবজাতককে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে করে এক-চার দিনের নবজাতক মৃত্যুর হারও এ হাসপাতালে অনেক বেশি। এর বাইরে নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত কারণে জ¦র এবং শ^াসকষ্টে আক্রান্ত হয়েও অনেক শিশু মারা যাচ্ছে।’