নিজস্ব প্রতিবেদক :
দুর্গাপূজা এখন সর্বজনীন উৎসব। মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয়ে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত মুখর থাকে আনন্দ আয়োজনে। কিন্তু মাত্র ২০-২৫ বছর আগে যে কয়টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হতো, সেখানো বাজত মাইক। মণ্ডপ সাজানো হতো রঙিন কাগজ আর বর্ণিল জরিতে।
এখন সেখানে স্থান করে নিয়েছে সাউন্ডবক্স, আর রকমারি বৈদ্যুতিক আলোর কারসাজি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁয় আগে দুর্গাপূজা হতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে। ধনী পরিবারগুলো নিজ বাড়িতেই পূজার আয়োজন করত। এখনো সেই চল রয়েছে।

তবে বারোয়ারি পূজামণ্ডপগুলো এখন বেশি জাঁকজমক হওয়ায় ভক্তদের ভিড় সেখানেই বেশি।
তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রাচীনকালে নওগাঁর রাজা-জমিদারদের দুর্গোৎসব আয়োজনের ইতিহাস। রাজা বা জমিদারদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের রাজ পুরোহিতদের নামও। যাদের মন্ত্রপাঠে মণ্ডপ হয়ে উঠত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, নওগাঁ জেলার পার্শ্ববর্তী রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার তাহিরপুরের জমিদার এ অঞ্চলে দুর্গামূর্তির বর্তমান আকৃতি দেন। বাগমারা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বারনই নদীপথে একবার দুর্গাদেবী এসেছিলেন। সে সময় তাহিরপুর রাজা ছিলেন কংস নারায়ণ রায়। তিনি মনস্থির করলেন প্রাসাদের মণ্ডপে দুর্গাদেবীর এমন একটি প্রতিমা স্থাপন করবেন, যাতে মা দুর্গার রূপ প্রতিভাত হয়। সেই মনোবাসনা পূরণ করতে গিয়ে তিনি পুরোহিত, ঠাকুর, পণ্ডিত ও প্রতিমা কারিগরদের সঙ্গে পরামর্শ করেন।
এরপর (১৪৮০ খ্রিস্টাব্দ, ৮৮৭ বঙ্গাব্দ) রাজা কংস নারায়ণ রায় রাজবাড়ির পূজামণ্ডপে স্থাপন করলেন দশভুজা মা দুর্গার প্রতিমা, যা এখন ভারতবর্ষজুড়ে দুর্গাদেবীর সেই অবয়বই প্রচলিত রয়েছে।
নওগাঁর রাজা-জমিদার আর বনেদি পরিবারগুলোই মূলত ধুমধাম করে দুর্গাপূজা পালন করতেন। দুর্গোৎসব ঘিরে জমিদার পরিবারে আয়োজন করা হতো মেলা, থিয়েটার, যাত্রা, টপ্পাগান, কবিগান ও জাদু প্রদর্শনী। কলকাতা, লখনউ ও পটনা থেকে আনা হতো বাজিয়ে ও গাইয়ে। আনা হতো দক্ষ প্রতিমা কারিগরও। সেইসঙ্গে প্রসাদ বিতরণ তো ছিলই। নওগাঁর মহাদেবপুর রাজা, বলিহার রাজা, দুবলহাটী রাজা, কাশিমপুর রাজা, ভবানীপুর জমিদার, শৈলগাছি জমিদার দুর্গোৎসবে রাখতেন অগ্রণী ভূমিকা।
শৈলগাছী জমিদার
নওগাঁর শৈলগাছির জমিদার সরবিন্দুনাথ রায় চৌধুরীর পুরোহিত ছিলেন সোনাতন চক্রবর্ত্তী (কাব্যতীর্থ)। তাঁর সময় জমিদার বাড়িতে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব হতো। এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে প্রজা ভক্তরা জমিদার পরিবারের মণ্ডপের সামনে জমায়েত হতেন। ভক্তদের জন্য প্রসাদ তো ছিলই, সঙ্গে তিনবেলা ভোজনের ব্যবস্থাও থাকতো। সেটা চলতো দশমীর পরের দিন পর্যন্ত। সোনাতন চক্রবর্ত্তীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সুধাংশু ভূষণ চক্রবর্ত্তী জমিদার বাড়ির পুরোহিত নিযুক্ত হন। এরপর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে জমিদার বাড়ির ওই পূজা ওই এলাকার অন্য একটি স্থানে বারোয়ারি পূজামণ্ডপে উদ্যাপিত হতে থাকে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, শৈলগাছীর জমিদাররা প্রতিবছর খাজনার একটি অংশ আলাদা করে রাখতেন। জমানো অর্থের পুরোটাই দুর্গাপুজায় ব্যয় করতেন। সেখানে টান পড়লে মূল রাজস্ব থেকেও উৎসবের জন্য টাকা ব্যয় করতেন। দুর্গাপুজা ঘিরে উৎসব চলতো প্রায় ১০ দিন ধরে। প্রজা ও অতিথির মিলন মেলায় পরিণত হতো জমিদার বাড়ি। আতশবাজি ফোটানো, যাত্রা, থিয়েটার, মেলার আয়োজন তো থাকতোই। আগতদের জন্য তিনবেলা খাওয়া ও প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা ছিল।
ভবানীপুর জমিদার
নওগাঁর (বর্তমানে আত্রাই উপজেলার অন্তর্গত) ভবানীপুর জমিদার প্রিয় শংকর চৌধুরী ও তাঁর পূর্বপুরুষরা জমিদার বাড়ির মণ্ডপে ধুমধাম করে দুর্গাপূজা পালন করতেন। ভবানীপুর জমিদার কালীনাথ চৌধুরীর দুই স্ত্রী রাজলক্ষ্মী ও বসন্ত কুমারী। বসন্ত কুমারীর ছেলে গ্রিরিজা শঙ্কর চৌধুরী। গ্রিরিজা শঙ্করের মৃত্যুর পর তার ছেলে প্রিয় শঙ্কর চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করে জমিদারী পরিচালনা করতে থাকেন। এই জমিদারদের পুরোহিত ছিলেন শ্যামানন্দ মিশ্র।
মূলত গিরিজা শঙ্কর চৌধুরীর সময় ব্যাপক উৎসাহে দুর্গাপূজা উদযাপিত হতে থাকে ভবানীপুর জমিদার বাড়িতে। এই জমিদারদের বিশেষত্ব ছিল পাঁঠাবলি। দুর্গাপূজার সপ্তমীর দিনে সাতটি পাঠা, অষ্টমীর দিনে আটটি, নবমীর দিনে ৯টি পাঠা বলি দেওয়া হতো। এছাড়া সন্ধিপূজার দিন একটি পাঠা বলি দেওয়া হতো। তবে বিশেষভাবে একটি বলির ব্যবস্থা ছিল। সেটা প্যারাবলী। এদিন একটি বড় আকারের মহিষ বলি দেওয়া হতো। ১২ দিন ধরে চলতো আয়োজন। থাকতো যত্রা, থিয়েটার, মেলা, কবিগান, পুঁথিপাঠসহ নানা আয়োজন। প্রজাদের খাবার সরবরাহ করা হতো তিন বেলা। এছাড়া প্রসাদ বিতরণ তো ছিলই। বর্তমানে এই পরিবারের এক কুমার এই বাড়ির একটি অংশে বসবাস করেন। রাজা প্রিয় শঙ্কর চৌধুরীর নাতি প্রতাপ শঙ্কর চৌধুরীর ছেলে অভিজিৎ চৌধুরী। তিনি এখনও ওই প্রাচীন মণ্ডপে প্রতিবছর নিয়মিত দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। বংশ পরম্পরায় এখন এই জমিদার পরিবারের পুরোহিত চিন্ময় মিশ্র।
দুবলহাটী রাজবাড়ি
এই রাজ পরিবারে ঘটা করে দুর্গাপূজা শুরু হয় জমিদার রঘুনাথের সময়। আয়োজন থাকতো ব্যাপক। চলতো প্রায় ১০ দিন ধরে। প্রজা ও ভক্তদের জন্য ছিল তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা। দুর্গাপুজা ঘিরে বসতো মেলা। কলকাতা ও পাটনা থেকে আনা হতো গাইয়ে ও বাদকদলকে। ওই সময় রাজ পুরোহিত ছিলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপাধ্যায়। এছাড়া, কবিগান, থিয়েটার, যাত্রাপালা, টপ্পা গানের আয়োজন করা হতো। হরেক রকম পসরা নিয়ে বসতেন মেলাজুড়ে দোকানিরা। পরে রাজা রায় বাহাদুর হরনাথ রায় তাঁর ছেলে ঘনদা নাথ রায় ও রাজা কৃঙ্করী নাথ রায়ের সময় দুর্গাপূজা ঘিরে দুবলহাটী এলাকাজুড়ে দুর্গাপূজার দিনগুলোতে রাজা, অমাত্য, রাজ কর্মচারী, অতিথি ও প্রজা-ভক্তদের মিলন মেলায় পরিণত হতো। এই রাজবাড়িরও স্থায়ী দুর্গাদালান ছিল। ছিল পাঠাবলীর ব্যবস্থা। পূজার প্রতিটি লগ্নে প্রসাদ বিতরণ করা হতো।
বলিহার রাজবাড়ি
এই রাজ পরিবরের রাজাদের মধ্যে রাজেন্দ্রনাথ ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ব্যাপক আয়োজনের মধ্যে দিয়ে স্থায়ী মণ্ডপে দুর্গাপূজা শুরু করেন। রাজবাড়ির ভেতর দেবালয়ে পৃথক দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করে রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য দুর্গোৎসব আয়োজন করা হতো। পরে রাজা কৃষ্ণেন্দ্র নাথ রায় বাহাদুর দুর্গাপূজার আয়োজন হতো বড় আকারে। তাঁর ছেলে শরবিন্দু রায় এবং তাঁর ছেলে কুমার বিমেলেন্দু রাজ পরিবারের দুর্গোৎসবের প্রথা ধরে রাখেন। প্রাসাদের কাছেই স্থায়ী দুর্গামণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করে প্রতিবছর আয়োজন করা হতো সার্বজনীন শারদীয় দুর্গাপুজার। দেশ বিভাগের সময় এবং জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে অন্যসব রাজার মতো বলিহারের রাজার উত্তরাধিকারী বিমেলেন্দু রায়ও চলে যান ভারতে। থেমে যায় রাজবাড়ির সেই আয়োজন। তবে কুমার বিমেলেন্দু রায় যতদিন ছিলেন, তিনি বলিহার রাজাদের পূজা আয়োজনের পুরনো প্রথা ধরে রেখেছিলেন। ওই সময় রাজ পুরোহিত ছিলেন শ্রী গাংলী চক্রবর্ত্তী। এই রাজবাড়িতে পাঠাবলি হতো দুর্গাপূজা উপলক্ষে। পাঠাবলি দেওয়ার কাজটি করতেন কানাই মণ্ডল। প্রজাদের জন্য থাকতো তিনবেলা খাবারের আয়োজন। এছাড়া পূজার লগ্নে প্রসাদ বিতরণ তো ছিলই। ১০ দিন ধরে চলতো যাত্রাপালা, কবিগান, টপ্পা, পুঁথিপাঠ, থিয়েটার, প্রাসাদের সামনে খোলা জায়গায় বসতো মেলা। রাজবাড়ির বহিরাঙ্গনের সেই দুর্গামণ্ডপটি ধ্বংস হওয়ায় এখন স্থানীয়দের উদ্যেগে প্রাসাদ প্রাঙ্গনে কালিমন্দিরের বারান্দায় বেদী বসিয়ে ১৯৯০ সালের পর থেকে দুর্গোৎসব আয়োজিত হয়ে আসছে।
মহাদেবপুর রাজবাড়ি
মাহাদেপুর রাজবাড়ির ভেতর ও বাইরে পৃথক স্থায়ী মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হতো। এই রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দুর্গাপূজার জন্য রাজকোষ থেকে পৃথক খরচের ব্যবস্থা থাকতো। দেশভাগের আগ পর্যন্ত ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রায় ১২ দিন ধরে চলতো শারদীয় দুর্গোৎসব। আগত অতিথি ও প্রজাদের জন্য থাকতো তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা। ঢাকের বাজনায় মুখরিত হয়ে উঠতো জমিদারবাড়ি। থাকতো মেলা, নাটক, যাত্রাপালা, কবিগান, টপ্পা, বাজি ফোটানোসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা। লগ্নে লগ্নে প্রসাদ বিতরণ। ঢাকিদের প্রতিযোগিতা হতো। রায় বাহাদুর রাজা নারায়ণ চন্দ্র রায় চৌধুরীর সময় পূজা ঘিরে উৎসাহের পরিমাণটা একটু বেশিই হতো। ওই সময় রাজপুরোহিত ছিলেন শ্রী শ্রী ক্ষীরেশ্বর আচার্য। বিশেষভাবে আয়োজন করা হতো পাঠাবলির। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ আর ঢাকের শব্দ জানান দিত শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসাহ আর উদ্দীপনার। প্রাসাদের বাইরে বসতো মেলাকে কেন্দ্র করে নানা পসরার দোকান। নবমীর দিনে ধঞ্চেনাচ প্রতিযোগিতা হতো।
কাশিমপুর রাজবাড়ি
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর রাজবাড়িটি একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। এই রাজবাড়িটির সব স্থাপনা ও কারুকার্য ধ্বংসের পথে। পাগলা রাজার রাজবাড়ি বলে এটি বেশি পরিচিত। রাজবাড়িটির উত্তর পাশের মন্দিরটির কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। তবে রাজবাড়ি না থাকলেও ছড়িয়ে আছে রাজবাড়ির দুর্গাপূজা ঘিরে নানা বর্ণিল দিনের কথা। শ্রী অন্নদা প্রসন্ন লাহেড়ী রায় বাহাদুর ছিলেন এই রাজত্বের শেষ রাজা। তাঁর সময় রাজবাড়িতে ব্যাপক আয়োজনে দুর্গাপূজা হতো। শ্রী অন্নদা প্রসন্ন লাহেড়ী রায় বাহাদুরে চার ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। অন্নদা প্রসন্ন লাহেড়ীর সময় রাজপুরোহিত ছিলেন শ্রী মহেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্ত্তী। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজবংশের সবাই পাড়ি জমান ভারতে। থেকে যান শুধু ছোট রাজা শ্রী শক্তি প্রসন্ন লাহেড়ী। তিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এখানে ছিলেন। এই রাজবাড়িতে অনুষ্ঠিত হতো নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে দুর্গাপূজা। যাত্রাপালা, থিয়েটার, টপ্পা, কবিগান, ঢাকিদের প্রতিযোগিতা। কলকাতা থেকে আনা হতো বাজিকরকে। এই বাজিকররা প্রাসাদের বিশেষ ব্যবস্থায় পটকা ও আতশবাজি তৈরি করে ফোটাতেন। দূর্গাপুজার পঞ্চমীর দিন থেকে নবমীর দিন গভীর রাত পর্যন্ত। এই রাজবাড়ির কাছেই বসত মেলা। সেই মেলা চলতো দশমীর দিন পর্যন্ত।
নওগাঁর বর্তমান দুর্গোৎসব
কালিতলা ক্লাব পূজামণ্ডপ নওগাঁ শহরের প্রথম বারোয়ারি পূজামণ্ডপ। শতবর্ষী এই পূজামণ্ডপটিতে নিয়মিত সব পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বর্তমানে মণ্ডপটি সংস্কার করে আধুনিক অকাঠামোয় আনার কাজ চলছে। কথিত রয়েছে তৎকালীন দুবলহাটীর জমিদার রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর এই বারোয়ারি পূজামণ্ডপটি তৈরির কাজে বাধা দিতে লাঠিয়াল পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় যুবকদের প্রতিরোধের মুখে জমিদারের লাঠিয়ালরা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। ধারণা করা হয় মণ্ডপটি নির্মাণ করা হচ্ছিল (বর্তমান পুরাতন কাঠহাঠি) কাছারিবাড়িসংলগ্ন স্থানে। এতেই জমিদার ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পরে তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরে মণ্ডপ নির্মাণে বাধা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
নওগাঁর পুরোহিতদের কথা বলতে গেলে সর্বপ্রথম যাঁর নাম চলে আসে, তিনি হলেন প্রয়াত রথীনন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী (রথী ঠাকুর)। তিনি ছিলেন নওগাঁর সর্বজন প্রদ্ধেয় পুরোহিত। এছাড়া নিত্যেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, সোমনাথ ভট্টাচার্য, নরেন্দ্রনাথ মজুমদার, বিদ্যুৎ চক্রবর্ত্তী, সতু ঠাকুর, বিকাশ চক্রবর্ত্তী, ময়না ঠাকুরসহ কয়েকজন পুরোহিত। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে অনেক অভিজ্ঞ পুরোহিত রয়েছেন।
নওগাঁ শহরের শ্রীশ্রী বুড়াঁ কালিমাতা পূজামণ্ডপে এখন ধুমধাম করে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। মণ্ডপটি অনেক পুরনো। শহরে রয়েছে আরো অনেক মন্দির। উত্তরপার নওগাঁ শিব মন্দির, তুলাপট্টির শিব মন্দির, কালিতলা রাধাকৃষ্ণ মন্দির, ডালপট্টি ধর্মতলা মন্দির, সুপারিপট্টির রক্ষা মায়ের মন্দির, শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ জিউ মন্দির (আখড়া বাড়ি), আনন্দময়ী শিব মন্দির, লোকনাথ বাবা মন্দির দক্ষিণ পার-নওগাঁ, নওগাঁ সেবাশ্রম সংঘ মন্দির, শিবপুর ইসকন মন্দির। এই মন্দিরগুলোতে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হয়ে আসছে।
নওগাঁ শহরে দেবী বিসর্জন দেওয়া হয় ছোট যমুনা নদীর মঠের ঘাটে। পাঁচ বছর আগেও ছোট যমুনা নদীর পারে এখনকার মতো বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ছিল না। তাই দুর্গাদেবী বিসর্জনের দিনগুলোতে নদীর দুই তীরে দর্শনার্থীদের ভিড়, সেইসঙ্গে ঢাকের শব্দে মুখর থাকতো। এক এক করে বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে বড় বড় নৌকাগুলোয় প্রতিমা তোলা হতো। বিকেল থেকে বিসর্জনের নির্ধারিত ক্ষণ পর্যন্ত প্রতিমাবাহী নৌকাগুলো নদীর মাঝে মঠের ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দিতো। এখনো সেভাবেই বিসর্জন দেওয়া হয়। তবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সেই মুক্ত নদীর তীরকে অনেকটাই সংকুচিত করে ফেলেছে।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে নওগাঁয় বসে মিলনমেলা। স্থানীয়দের বাড়িতে আসে আত্মীয়-স্বজন, অতিথি। অনেকে নওগাঁ ছেড়ে অন্যত্র যান। এই চিত্র নওগাঁ সদরসহ ১১টি উপজেলার। জেলার প্রতিমা কারিগররা বছরজুড়ে ব্যস্ত থাকেন। নওগাঁ তো বটেই,পাশের অনেক জেলায়ও দুর্গা প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় নওগাঁ থেকে।
নওগাঁ শহর বিস্তৃত হলেও স্বাভাবিকভাবেই পূজামণ্ডপগুলো রয়ে গেছে সেই পুরনো স্থানগুলোতেই। শহরে জনসংখ্যা বেড়েছে। তাই দুর্গোৎসবে শহরে নামে মানুষের ঢল। বিসর্জনের দিন শহরের পার-নওগাঁর আলুপট্টিতে বসে গ্রামীণ মেলা। আলতা, সিঁদুর, শাখা-পলা, রঙিন ফিতে, কাচের চুড়ি, বাঁশের বাঁশি, খেলনা, পুতুল, মাটির নক্সি হাড়ি, নক্সি কলস, বেলুন, ভুট্টার খৈ, মুড়ি, গুড়ের মুরকি, জিলেপি, লাড্ডু, রসগোল্লা, সন্দেশ, চিনির মুরকি, মিছরি, বাতাসা, গুড়-চিনির গজা, শনপাপড়ি, হাওয়াই মিঠাই, তালের পাখা, নকশি পাখা কতো সব পসরা নিয়ে বসে দোকানিরা।









