নওগাঁ

প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কালো সৈনিক পোকায় সফল নাহিদ, মাসে আয় ২৫ হাজার

নিউজ ডেস্ক১০ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:


নওগাঁয় বিষমুক্ত মাছ চাষে বাণিজ্যিক মৎস্যখাদ্যের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব কালো সৈনিক পোকা চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন প্রতিবন্ধী যুবক নাহিদ হোসেন। নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার লোহাচূড়া গ্রামে প্রথমবারের মতো কালো সৈনিক পোকা চাষ করে সফলতা পেয়েছেন তিনি। পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’ নাহিদ হোসেনকে খামার স্থাপনে সহযোগিতা করেছে। ইতোমধ্যে অধিক আমিষসমৃদ্ধ এই পোকা চাষ করে নিজের পুকুরে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত পোকা বিক্রি করে প্রতি মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করছেন নাহিদ।

কালো সৈনিক পোকা আলো-বাতাস চলাচল করে এমন ঘরের মধ্যে রাখতে হয়। পোকাগুলো প্রজনন সম্পন্ন করার পর কাঠের স্তরের মধ্যে ডিম পাড়ে। সেই ডিমগুলো হ্যাচিং করে ফোটানোর কিছুদিন পর আলাদা জায়গায় রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে তৈরি হয় লার্ভা। ময়লা ও আবর্জনা থেকে পাঁচটি ধাপে ১৫-১৬ দিনে উৎপাদন হয় এ পোকা। এরপর খাওয়ার উপযোগী হলে পুকুরে মাছের খাবার হিসেবে দেওয়া হয়। কালো সৈনিক পোকা উৎপাদনে আলাদা কোনো খাবারের প্রয়োজন হয় না। এই পোকা উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতেও ভূমিকা রাখছে।

উদ্যোক্তা নাহিদ হোসেন বলেন, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’ থেকে তার বাবার নামে এক লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণের টাকা দিয়ে স্মার্ট পিসিকালচার উপ-প্রকল্পের সহযোগিতায় স্বল্প পরিসরে কালো সৈনিক পোকার ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্মার্ট প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকার অনুদান পান। অনুদানের টাকা দিয়ে ব্যবসা বড় করেন। বর্তমানে তার খামারে দুজনের কর্মসংস্থানও হয়েছে।



তিনি বলেন, প্রতি কেজি কালো সৈনিক পোকা উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৬৫ টাকা। আর বিক্রি হয় ২৫০-২৭০ টাকা কেজি দরে। প্রতি মাসে ৪০০-৫০০ কেজি কালো সৈনিক পোকা উৎপাদন হচ্ছে। নিজের পুকুরে মাছের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে মাসে আয় হচ্ছে প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা।

তিনি জানান, তার এমন উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং ছোট ও মাঝারি আকারে খামার গড়ে উঠছে। ময়লা-আবর্জনা থেকে কালো সৈনিক পোকা উৎপাদন হওয়ায় পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কালো সৈনিক পোকা যেমন পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখছে, তেমনি এটি প্রোটিনের বিকল্প উৎস হতে পারে। এলাকায় তিনি ‘ব্ল্যাক সোলজার নাহিদ’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন বলেও জানান।

মৌসুমী স্মার্ট-পিসিকালচার উপ-প্রকল্পের এমআইএস ও ডকুমেন্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, নাহিদ হোসেন তাদের প্রকল্পের এক অনন্য উদাহরণ। কালো সৈনিক পোকা উৎপাদন একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তি, যা চাষিদের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। নাহিদ প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও কালো সৈনিক পোকা চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তার সাফল্য দেখে অনেকেই উৎসাহিত হচ্ছেন। কালো সৈনিক পোকা বিভিন্ন বর্জ্য ভক্ষণ করে বেড়ে ওঠে। এছাড়াও ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে। মৌসুমী স্মার্ট প্রকল্প থেকে সব সময় নাহিদকে কারিগরি সহযোগিতা করা হচ্ছে। আমরা চাই, এই প্রযুক্তি মৎস্যচাষিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ুক এবং আরও বেশি চাষি উপকৃত হোক।

রাণীনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, মাছ চাষে বিকল্প প্রোটিনের উৎস হিসেবে কালো সৈনিক পোকা এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হচ্ছে। নাহিদ হোসেন এই প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করে যে ফলাফল দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার পুকুরে মাছের বৃদ্ধি যেমন বেড়েছে, তেমনি খাদ্য ব্যয়ও কমেছে। পাশাপাশি প্রতি মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। এটি অন্য চাষিদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত। শুকনো অবস্থায় কালো সৈনিক পোকার লার্ভা থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ প্রোটিন পাওয়া সম্ভব, যা প্রাণিজ প্রোটিনের একটি বড় উৎস হতে পারে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী স্মার্ট প্রকল্প’ থেকে নাহিদকে সহযোগিতা করা হয়েছে। উপজেলা মৎস্য দপ্তর থেকে এই ধরনের উদ্যোগকে আমরা সব সময় উৎসাহ দিয়ে থাকি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ অব্যাহত রয়েছে।

 

সূত্র: ঢাকা পোস্ট