নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীতে মেডিক্যাল ভিসা করতে এসে ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে শতশত রোগী এবং তাঁদের স্বজনদের। টানা দুই-তিন দিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকেই স্ট্যাট ব্যাংকে টাকা জমা দিতে না পেরে ভিসা পাচ্ছেন না। আবার স্থানীয় দালাল এবং ভবন মালিকের ছেলে শিমুল হোসেনকে টাকা দিলেই মিলছে ভিসা।

টাকা না পেয়ে কখনো কখনো ভবন মালিকের ছেলে শিমুল হোসেন জোর করে লাইন ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধরে ধরে পেটাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে রাত জেগে মেডিক্যাল ভিসার জন্য লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে নতুন করে রোগী হয়েও বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে অনেককেই।
সর্বশেষ গত সোমবার রাতেও এমন ধরনের ঘটনার অবতারণা ঘটে নগরীর বর্ণালী মোড়ে অবস্থিত স্ট্যাট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রাজশাহী কার্যালয়ের সামনে।
- ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভবনটির মালিক আনছার আলীর ছেলে শিমুল রাস্তায় লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের ওপর হঠাৎ হামলা করে লাইন ভেঙে দিয়ে তার লোকজনকে ঢুকিয়ে দেন। এতে দুই বৃদ্ধসহ অন্তত ৫ জন আহত হন। এ ঘটনার পরে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে শিমুলকে ধরে বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে পুলিশ শিমুলকে ছেড়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল মঙ্গলবার সকালে মেডিক্যাল ভিসার ৬০০ টাকা ফি জমা দেওয়ার জন্য আগের দিন সোমবার দুপুরেই স্ট্যাট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া কার্যালয়ে সামনে এসে জড়ো হয়ে লাইনে দাঁড়ান অন্তত তিন শ ভিসাপ্রত্যাশী। এরপর থেকেই তাঁরা পেপার বা পাটি বিছিয়ে অথবা শুধু মাটিতেই বসে এবং শুয়ে থেকে পরের দিন সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন ভিসা প্রত্যাশীরা। কিন্তু রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ করে ভবন মালিকের ছেলে শিমুল এসে লাইনের সামনে দাঁড়ানো মকবুল হোসেন নামের এক বৃদ্ধসহ অন্তত ১০জনকে সরে যেতে বলেন।
এসময় মকবুল এর প্রতিবাদ জানালে শিমুল তাকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। এ দৃশ্য দেখে লাইনে দাঁড়ানো ভিসা প্রত্যাশীরা প্রতিবাদ জানালে তাদের ধরে পেটাতে থাকেন শিমুল এবং তার সেঙ্গ আরো তিন-চারজন। একপর্যায়ে তারা দুই বৃদ্ধসহ অন্তত ৫জনকে পিটিয়ে আহত করেন। তাদের মারপিটের ভীত সন্ত্রস্ত ভিসাপ্রত্যাশীরা লাইন ছেড়ে দিকবিদিক পালিয়ে যেতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের ওপর এমন হামলার দৃশ্য দেখে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে শিমুলকে আটক করে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলে শিমুলকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
কুষ্টিয়ার সদর এলাকার আলিমা বেগম জানান, তাঁর হার্টেল সমস্যা। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে জরুরী ভিত্তিকে ইন্ডিয়া গিয়ে অপারেশন করাতে হবে তাঁকে। সে অনুযায়ী ভিসার জন্য সকল কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে সোমবার সকালে বৃদ্ধ মা শুকুরন নেসাকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীতে আসেন আলিমা।
- তবে ওইদিন স্ট্যাট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রাজশাহী কার্যালয়ের সিরিয়াল না পেয়ে পরের দিন মঙ্গলবারের জন্য সিরিয়াল পেতে লাইনে দাঁড়ান আলিমা। মা শুকুর নেসাকে সঙ্গে নিয়ে পালাক্রমে লাইনে অপেক্ষা করতে থাকেন তারা। শীতের রাত উপেক্ষা করে বৃদ্ধ মাকে সঙ্গে নিয়ে লাইনে অপেক্ষা করার একপর্যায়ে হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে তাদের সেখান থেকে সরে যেতে বলেন।
এরপর আর সামনের লাইনে আসতে পারেননি আলিমা বেগম। ফলে গত মঙ্গলবার সকালে তাঁর সিরিয়াল গিয়ে পড়ে ১৬৮ তে। কিন্তু তার আগেই ব্যাংক থেকে টাকা জমা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর গতকালও ভিসা হাতে পাননি আলিমা বেগম।
কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার নন্দলালপুর এলাকার জলি বেগম অসুস্থ বোন ডলি বেগমের চিকিৎসা ভিসা করতে গত রবিবার রাজশাহী আসেন তিনি। এরপর ওইদিন দুপুরে লাইনে দাঁড়ান তিনি পরের দিন সোমবারে ব্যাংকে প্রবেশ করে ভিসার ফি জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ৪৭ নম্বর সিরিয়ালে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জলি বেগম পরের দিন সোমবার ব্যাংকে প্রবেশ করার টোকেন পাননি।
এর ফলে সোমবার থেকে আবারো লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। ওইদিন তিনি সিরিয়াল পান ৪১। তবে মঙ্গলবার সেই সিরিয়াল হয়ে গিয়ে ১০১ নম্বরে। কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো ৩০-৪০ জনের টাকা জমা নিয়েই লাইন ভেঙে দেওয়া হয়।
পাবনার বেড়া উপজেলা সদর এলাকার আলহাজ জানান, ঘাড়ের সমস্যার কারণে জরুরী ভিত্তিতে ভারতে যেতে হবে। দ্রুত অপারেশন না করাতে পারলে প্যারালাইসিস হতে পারে বলে চিকিৎসক জানিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে গত সোমাবর দুপুরে রাজশাহীতে ভিসা নিতে এসে লাইনে দাঁড়ানোর পরে তার সিরিয়াল হয় ১৫। কিন্তু রাত সাড়ে ১০টার দিকে এসে ভবন মালিকের ছেলে শিমুল হঠাৎ হামলা করে লাইন ভেঙে দেয়।
- এরপর রাত ১১টার দিকে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল হয় ১১৫। কিন্তু তার আগেই টাকা জমা নেওয়া বন্ধ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে গত মঙ্গলবার আবার লাইনে দাঁড়ান আলহাজ পরের দিন বুধবার সকালে টাকা জমা দেওয়ার জন্য।
বিপ্লব হোসেন, আজমত হোসেনসহ আরো অনেকে অভিযোগ করে জানান, রোদ, বৃষ্টি বা শীত সব কষ্ট সহ্য করে দুই-তিন দিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সাধারণ মানুষ সহজে চিকিৎসা ভিসা পাচ্ছেন না। কিন্তু ভবন মালিকের ছেলে শিমুলকে ২-৫ হাজার টাকা দিলে তিনি টাকা জমা দেওয়ার জন্য সিরিয়াল আগে নিয়ে দেন। তাকে টাকা না দেওয়া হলেই তিনি রাতে নিজে এসে সামনের লোকজনকে সরিয়ে দিয়ে তার লোকজনকে সিরিয়াল নিয়ে দেন। এসময় প্রতিবাদ করলেই সাধারণ লোকজনকে পিটিয়ে সরিয়ে দেন শিমুল।
- তারা আরো অভিযোগ করে আরো জানান, ব্যাংকে প্রতিদিন প্রায় এক-দুই শ জনের টাকা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ভিসা প্রত্যাশী থাকেন অন্তত এক হাজার জন। এ কারণে এক-তিন দিন আগে থেকেই রাত জেগে সাধারণ মানুষ সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। আর সেই সুযোগে ভিসার আগে সিরিয়াল নিয়ে দিতেই ভবন মালিক শিমুল প্রতি রাতেই সাধারণ মানুষকে ধরে পেটান। ফলে ভিসা নিতে এসে অনেকেই আহত হয়ে আবার বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু চিকিৎসা ভিসা পাচ্ছেন না তারা।
তবে টাকার জন্য সাধারণ ভিসা প্রত্যাশী মানুষের ওপর হামলার কথা অস্বীকার করে ভবন মালিক আনছার আলীর ছেলে শিমুল বলেন, ‘আমি কোনো সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ করি না। কাউকে মারপিটও করিনি। বাড়ির সামনে রাতে লোকজন দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের সরিয়ে দিয়েছি। এ নিয়ে আমার ওপরেই হামলা হয়েছে।’ জানতে চাইলে নগরীর
বোয়ালিয়া থানার ওসি শাহাদত হোসেন বলেন, ‘ভিসাপ্রত্যাশীর সংখ্যা অনেক। কিন্তু দেওয়া হয় অল্পসংখ্যক। এ কারণে প্রতিদিন সিরিয়াল নিয়ে জামেলা হচ্চে। আবার সিরিয়াল বিক্রি হচ্ছে। তাই এখন থেকে আর কাউকে লাইনে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। সকাল আটটার সময় ভিসা প্রদানের সময়ই কেবল সেখানে লাইনে দাঁড়াতে পারবেন লোকজন। তাতে অন্তত মারামারি বা সিরিয়াল বিক্রিরও কোনো সুযোগ থাকবে না।’
তবে বিষয়টি নিয়ে স্ট্যাট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার রাজশাহী কার্যালয়ের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা মিডিয়ার সামনে কিছু বলবেন না বলে জানিয়ে দেন।
স/আর









