জাতীয়

রাজশাহী বিআরটিএ: ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা

নিউজ ডেস্ক৫ মে ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ) রাজশাহী আঞ্চলিক অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়ন, গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশন, রেজিস্ট্রেশন নবায়ন, ফিটনেস নবায়নসহ যানবাহন সংক্রান্ত নানা সেবা দেওয়া হয়।

শুধুমাত্র গড়ে প্রতিদিন অনলাইনে একশ আবেদন জমা পড়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য। এর বিপরীতে সপ্তাহে এক থেকে দুইদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়। আবেদনকারীদের মোবাইলেই পরীক্ষার দিনক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হয়।

নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী আবেদনকারীরা পরীক্ষা দিতে এলে প্রথমে তাঁদের বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করা হয়। তার পর লিখিত পরীক্ষা শেষে ব্যবহারিক (গাড়ি চালিয়ে) পরীক্ষা ও ভাইভা নেওয়া হয়। এই পরীক্ষায় টিকে গেলেই মেলে গাড়ি চালানোর সনদ।

কথাগুলো বলতে বা পড়তে যত সহজ মনে হলেও, আসলে এই কাজগুলো কখনোই সেবা গ্রহিতারা ঠিকঠাক মতো শেষ করতে পারেন না। যতক্ষণ একজন সেবাপ্রার্থী এই কার্যালয়ের সিন্ডিকেটের হাতে সর্বনিম্ন তিন হাজার টাকা না দিবেন, ততক্ষণ তাঁকে পরীক্ষায় পাশ করানো দূরের কথা নানা ভুল ধরে ওই পর্যন্ত যেতেই দেওয়া হয় না।

ফলে বিআরটিএ কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় সেবাপ্রার্থীকে। এমন অভিযোগ এ কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা একাধিক প্রার্থীদের। পুঠিয়ার রাজন আলী নামের একজন আদেনকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যাদের বিআরটিএ কার্যালয়ে পরিচিত কেউ আছে, তাঁদের কাজ এমনিতেই হয়। বা অল্প টাকাতেই হয়ে যায়। কিন্তু যাদের কেউ নাই মানে সাধারণ আবেদনকারী, তাঁদের ভোগান্তির যেন শেষ থাকে না।

আবেদনের পর শিক্ষানবিশ কাগজ (লার্নার) নিয়েই গাড়ি চালাতে হয় মাসের পর। কিন্তু পরীক্ষায় আর সহজে পাশ করা হয় না। আবার টাকা দিলে লিখিত থেকে শুরু করে আর কোথাও গিয়ে বাধার জায়গা থাকে না। টাকা না দিলেই যত ঝামেলা হবে। টাকা দিলে পানির মতো সহজেই হাতে এসে পৌঁছায় ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে অন্যান্য কাগজপত্র।’
বিআরটিএ সূত্র মতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার জন্য ৫ সদস্যের একটি পরিচালনা বোর্ড আছে।

এই বোর্ডের সভাপতি হলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের মনোনীত প্রতিনিধি। সদস্য সচিব বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক। অপর তিন সদস্য হলেন সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি, রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি ও রাজশাহী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের পাওয়ার বিভাগের ইন্সট্রাক্টর। পরীক্ষা শেষে এই পাঁচ সদস্যের কমিটির অনুমোদন দেওয়ার পরে মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স।

কিন্তু আদৌ এই বিআরটিএর কর্মকর্তাদের খুশি না করলে এই কমিটির কোনো হাত থাকে না পরীক্ষার পাশ-ফেইলের (অকৃতকার্য) জন্য। তবে সরাসরি বিআরটিএ কর্মকর্তারা ঘুষ নেন না। তাঁরা ঘুষ নেন বিশ^স্ত হাত ঘুরে। একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। যে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করেন রাজশাহীর কয়েকটি মোটরসাইকেলের শো-রুমের মালিক এবং বিআরটিএর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক সমুন হোসেন, সহকারী মোটরযান পরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আতাউর রহমানসহ ৮-১০ জনের একটি গ্রুপ।

গত মার্চ মাস থেকে রাজশাহী বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক নাই। এই সুযোগে বিআরটিএ’র এই সিন্ডিকেটটিই নিয়ন্ত্রণ করছে সবকিছু। তাঁদের গ্রিণ সিগন্যাল ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না।
সূত মতে, রাজশাহী বিআরটিএতে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ীর ফিটনেস, মালিকা পরিবর্তনসহ অন্যান্য সেবা সহজে মেলে না। বিশেষ করে ড্রাইভিংল এবং গাড়ির ফিটনেস সনদে ৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকে।

ড্রাইভিংয়ে (হালকা) লাইসেন্সের জন্য সর্ব নিম্ন তিন হাজার এবং ভারি লাইসেন্সের জন্য সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। সেই হিসেবে গড়ে এ অফিসে অন্তত অর্ধ কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে।
আব্দুল মালেক নামের দুর্গাপুরের এক সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘আমি প্রায় এক বছর লার্নার করে ঘুরেছি। টাকা ছাড়া দুইবার পরীক্ষা দিয়েছি। কোনো লাভ হয়নি। টাকা দেওয়ার পরে আর ঝামেলা হয়নি। মোটারসাইকেলের শো-রুমের ম্যানেজারের মাধ্যসে তিন হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পরেই পরীক্ষায় পাশ করতে পেরেছি।’
পবার ট্রাক চালক মাজেদুর রহমান বলেন, ‘টাকা না দিয়ে কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাই এটা আমার জানা নাই। একেকজনের নিকট থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে এখনো। রাজশাহী বিআরটিএ অফিসে একটা সিন্ডিকেটই আছে। টাকা দিলে ওখানে সবকিছু সহজ। কখনোই ড্রাইভিং লাইসেন্স দিবে না। আবার আমরা ট্রাকের ফিটনেসের কাগজ নবায়ন করকে গেলেও টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলেই ঝামেলা করে ওরা। নানা ভুল ধরে ফেরত পাঠাইয়ে দেয়। কিছু বলার থাকে না। কারো হাতে ৩-৪ হাজার টাকা ধরায় দিলে তখন আর কোনো কথায় বলবে না।’
গতকাল রাজশাহী বিআরটিএ কার্যালয়ে কথা হয় নগরীর উপশহর এলাকার এক ব্যক্তি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি অনলাইনে আবেদন করার পরে বার বার ভুল ধরা হচ্ছিল।

পরে মোটরসাইকেলের শো-রুমের মাধ্যমে যখন কাগজ দিলাম তখন আর কোনো ভুল হলো না। মাঝে চার হাজার টাকা দিতে হলো।’
জানতে চাইলে রাজশাহী বিআরটিএ’র মোটযান পরিদর্শক সমুন হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।

অফিসে কথা বলেন।’
জানতে চাইলে সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো: শাহজামান বলেন, ‘এই অভিযোগের কোনো সত্যতা আছে বলে আমার জানা নাই। তার পরেও কোনো অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’