রাজশাহীর খবর

বেপরোয়া হয়ে উঠছেন রামেক হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিৎসকরা

নিউজ ডেস্ক১৪ নভেম্বর ২০১৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের কয়েকজন ইন্টার্নি চিকিৎসক। চিকিৎসারত রোগীদের স্বজনদের মানসিক নির্যাতন তো আছেই তার ওপরে মারধরের ঘটনাও ঘটছে।

 

হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে এসে সঙ্গে আর্মস (গুলি) বা লাটি-সোঠাসহ ধারালো ছোরা সঙ্গে নিয়ে ঘুরা-ফেরা করে এমন অভিযোগও উঠছে ইন্টার্নি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। আর এগুলোই নিয়েই রোগীর স্বজনদের ওপর হামলিয়ে পড়ছে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। তবে এদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। আর এই কয়েকজন ইন্টার্নি চিকিৎসকই হাসপাতালটাকে অস্থির করে রেখেছে দিনের পর দিন। ফলে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন জেষ্ঠ্য চিকিৎসক বলেন, ডাক্তারদের নানা কথা বলবে রোগী এবং স্বজনরা। এটা মেনে নেওয়ার মানসিকতা না থাকলে চিকিৎসা পেশায় আসার কোনো মানে হয় না। কিন্তু সেই কাজটিই করছে এখনকার কিছু ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। এতে করে চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে।

রামেক হাসপাতালে গত এপ্রিল মাস থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত রোগী মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রোগীর স্বজনদের মারপিটের পর আটকে রেখে পুলিশের দেওয়া ছাড়াও চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেওয়ার একাধিক ঘটনাও ঘটেছে।

হাসপাতালে রোগী মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে মারামারির ঘটনা কয়কজন ইন্টার্নি ডাক্তারদের সঙ্গেই বেশি ঘটছে। রোগী মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে এইসব মারামারির যে ঘটনা ঘটছে-তা ইন্টার্নী ডাক্তারদের চিকিৎসায় অবহেলার কারণে হচ্ছে বলে  স্বজনরা বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন।

 

আবার  হাসপাতালে কর্মরত থাকায় অবস্থায় ডাক্তারদের কোন সমস্যার কথা বলা হলে নানাভাবে রোগীর স্বজনদের গালিগালাজ করেন ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। আবার অনেক সময় আসছি বলেও রোগীর কাছে আসেন না তারা। এর প্রতিবাদ করলেই রোগীর স্বজনদের ওপর নেমে আসে নানা ধরনের নির্যাতন। মানসিক থেকে শুরু করে কখনো কখনো শারীরিক নির্যাতনের পর্যায় গিয়েও গড়াচ্ছে স্বজনদের ওপর।

 

গতকাল রোববার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে রামেক হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে রোগীর স্ব্জন ও ইন্টানী চিকিৎসদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় নিহত মহাসিনের দুই ছেলেকে মারধরে করে পুলিশে দেয় ইন্টার্নি ডাক্তাররা। এ ঘটনায় আহতরা হলেন, তারা হলেন, রফিকুল ইসলাম (৪০) ও আনারুল ইসলাম (৩০)। আর এ ঘটনায় মা রাহেলা বেগম (৬০)। পরে বিকেলের  দিকে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।

 

নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, ডাক্তারদের এমন ব্যবহার হলে কোন দিন কোন রোগী ভালো হবে না। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মানুষ মারা যেতেই পারে। রোগী মারা গেলে সেটা নিয়ে রোগীর স্বজনরা একটু হিৎকার-চেঁচামেচি করবেন, এটাই স্বাভাবিক-তাই বলে তাদের ধরে দলবল নিয়ে পেটাবে এটা হতে পারে না। এর বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু উল্টো মৃত রোগীর স্বজনদেরই পুলিশ বারবার ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ কোন দেশ, এ কোন আইন?
চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যূ হয়। স্বজনদের অভিযোগ ডাক্তারদের অবহেলায় মারা যান মহসিন আলী। এ নিয়ে মহসীন আলীর স্বজনদের সাথে ডাক্তারদের কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে দলবল নিয়ে লাঠিসোটা ও পিস্তল হাতে হাতে রোগীর স্বজনদের উপর হামলা চালায় কয়েকজন ইন্টার্নি চিকিৎসক।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা সিল্কসিটি নিউজকে জানায়, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং রামেক ছাত্রলীগ সভাপতি শফিকুল ইসলাম অপু ও রায়হানের সাথে হাতাহাতি হয় মহসীন আলীর ছেলে আনারুল ও রফিকুল ইসলাম বাবুর সাথে। এরপর দলবল নিয়ে লাঠসোটা হাতে তাদের উপর অতর্কিত হামলা করে অপু। এ ঘটনার পর ওই ওয়ার্ডে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য রোগীর স্বজনেরা তাদের রোগীদের নিয়ে দিকবিদিক পালিয়ে যায়। পরে ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেয় ডাক্তাররা।

 

গত ১৫ এপ্রিল দুপুর সোয়া ১ দিকে নগর শ্রমিকলীগ নেতা ও সোনালী ব্যাংক লক্ষ্মীপুর শাখার কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন খান (৫৫) মৃত্যুর চিকিৎসকের অবহেলায় মারা যান বলে অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে রামেক হাসপাতালের চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসকের সাথে মৃতের স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা চিকিৎসা বন্ধ রেখে জরুরি বিভাগের সামনে বিক্ষোভ করে।

 

হাসহপাতাল সূত্র মতে, গত ৫ অক্টোবর হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইন্টার্নি চিকিৎসক অপুর সঙ্গে রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কর্মী জনি হোসেনের সঙ্গেও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পরে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা কিছু সময়ের জন্য হাসপাতালে কর্মবিরতি শুরু করেন।

 

হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘আমরাও ইন্টার্নি ছিলাম। কিন্তু এভাবে কখনো দিনের পর দিন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। বলা যায় কখনোই ঘটেনি। কিন্তু এখন ঘটছে। এর অন্যতম কারণ হলো ইন্টার্নি চিকিৎসকরাই। তাদের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা উঠে গেছে। রোগীর স্বজনরা কিছু বললেই তাদের ওপরই পাল্টা চড়া হচ্ছে। এ কারণেই একের পর এক হাসপাতালে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।’

 

রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানাউল্লাহ জানায়, বাবা মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে ইন্টানী ডাক্তারদের মধ্যে মারা মারির ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে হাসপাতালে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

স/আর