সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
ঈদের টানা ছুটিতে উৎসবের শহরে রূপ নিয়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবান। পর্যটকের ভিড়ে প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে এ পর্যটন নগরীতে। পাহাড়, মেঘ আর সবুজের অপার সৌন্দর্যঘেরা এ জনপদে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে ভ্রমণপিপাসুরা।
জেলার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো হলো নীলাচল, মেঘলা পর্যটনকেন্দ্র, নীলগিরি, প্রান্তিক লেক, শৈলপ্রপাত, বগালেক, দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং, নাফাকুম জলপ্রপাত এবং অমিয়াখুম জলপ্রপাত।

এসব কেন্দ্রে মানুষের উপচে পড়া ভিড় এখন। প্রত্যেক কেন্দ্রে জমেছে পর্যটকদের মিলনমেলা, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অনন্য মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে।
শহর থেকে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল-সবখানেই উৎসবের আমেজ-উচ্ছ্বাস আর প্রাণের স্রোত। বিশেষ করে নীলাচলের চূড়া থেকে ভেসে আসা মেঘের খেলা আর দিগন্তজোড়া নীলগিরির পাহাড়ী দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করছে।
অন্যদিকে দেবতাকুম, নাফাকুম ও অমিয়াখুম জলপ্রপাতের গর্জনধ্বনি আর শীতল জলধারায় প্রকৃতিপ্রেমীরা গ্রহণ করছে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। অনেকেই এই অভিজ্ঞতাকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ভ্রমণ হিসেবে বর্ণনা করছে।
রবিবার (২২ মার্চ) সকালে শহরের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র শৈলপ্রপাতে ঘুরতে আসেন মো. শাহীন ও সালমা শাহীন দম্পতি। রাজধানীর মালিবাগ থেকে আসা এই দম্পতি বলেন, ‘এই প্রথম আমরা বান্দরবানে এসেছি।
বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা আগে অনেক শুনেছি, তবে বাস্তবে এসে দেখছি। এটি কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর। চারদিকে সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ পাহাড়ের সমারোহ প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি। পাশাপাশি এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা আমাদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যে কোনো মানুষকেই মুগ্ধ করবে।
’
এদিকে, যেসব পর্যটক রোমান্সকর অনুভূতি চান তাদের জন্য বগালেক, কেওক্রাডং, নাফাকুম ও অমিয়াখুম হয়ে উঠেছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে এসব স্থানে পৌঁছাতে হলেও তরুণদের আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। বরং দলবেঁধে ট্রেকিংয়ে অংশ নেওয়া তরুণদের উপস্থিতি এবার চোখে পড়ার মতো। পাহাড়ি পথের কষ্টই তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দ।
দুর্গম বগালেক ও কেওক্রাডংয়ে ট্রেকিং করতে আসা রাজশাহীর পর্যটক কাইয়ুমূল হাসান জানান, ঈদের টানা ছুটি কাজে লাগিয়ে ১২ জনের একটি দল নিয়ে তারা বান্দরবানে ভ্রমণে এসেছেন। চার দিনের এই সফরে তারা বগালেক ও কেওক্রাডং এলাকায় ট্রেকিং করবেন এবং সেখানে রাত যাপন করবেন।
অন্যদিকে, পর্যটকদের এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় আবাসন খাত। শহরের হোটেল-মোটেল থেকে শুরু করে পাহাড়ি রিসোর্ট- কোনো কেন্দ্রেই ‘তিল ধারণের ঠাঁই নেই’ অবস্থা। ঈদের অন্তত ১০ দিন আগেই অধিকাংশ আবাসনকেন্দ্র অগ্রিম বুকিং হয়ে যায়।
গত কয়েক বছরে পাহাড়ে চরম অস্থিরতার কারণে পর্যটন খাতে কিছুটা স্থবিরতা দেখা গেলেও এবারের ঈদ নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে- এমনটাই মনে করছেন রুমা উপজেলার বগালেক এলাকায় অবস্থিত রিসোর্ট কুটির’র মালিক লালকিম বম। তিনি বলেন, এবার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ১৯ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত তাঁর কুটির সম্পূর্ণ বুকিং হয়ে গেছে। প্রতিদিনই শত শত পর্যটক আসছেন, যা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।
শহর থেকে ১২ মাইল দূরে চিম্বুক সড়কের ওয়াই জংশন এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় ১৮০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত সাইরু হিল রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান জানান, ঈদ উপলক্ষে রিসোর্টের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম ভাড়া হয়ে গেছে। ঈদের তিন দিন আগ থেকেই পর্যটকরা আসতে শুরু করেছে।
বান্দরবান হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জেলার শতাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠানে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ ছুটির কারণে প্রতিদিনই নতুন করে পর্যটক আসছেন।
পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের জন্য দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ বান্দরবান রিজিয়নের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. ফরিদ উদ্দিন খাঁন বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও তথ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি বলেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটির কারণে ইতোমধ্যে জেলায় বিপুল সংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি বান্দরবান এবারও প্রমাণ করেছে, ঈদের ছুটি মানেই পাহাড়ে মেঘের সঙ্গে এক অন্যরকম ভালোবাসার গল্প। তবে এই ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল ভ্রমণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা। তাহলে আগামী দিনগুলোতেও বান্দরবান থাকবে প্রকৃতি ও মানুষের স্বপ্নময় মিলনস্থল হিসেবে।









