রাজশাহীর খবর

সর্বনাশা পদ্মা এই বুঝি ছোবল দিয়ে সব গিলে খাবে

নিউজ ডেস্ক১ আগস্ট ২০১৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গত কয়েক বছরে বর্ষায় সর্বনাশা প্রমত্তা পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে করাল গ্রাসে পড়ে বিলিন হয়েছে রাজশাহীর পবা উপজেলার বাংলাদেশী সীমান্তবর্তি এলাকায় অবস্থিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’র (বিজিবি) চরখিদিরপুর সীমান্ত ফাঁড়িসহ (বিওপি ক্যাম্প) কয়েক শ হেক্টর জমি, গাছপালা ও ঘরবাড়ি।

চর খিদিরপুর বিওপিটিসহ পাশের তিন কিলোমিটার দূরে চর খানপুর বিওপি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে ২০১৩ সালে তড়িঘড়ি করে অস্থায়ী প্রতিরোধক বালুভর্তি বস্তা ফেলা হয়েছিল।

এর জন্য সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু ওই বছরই পানির নিচে তলিয়ে যায় চর খিদিরপুর বিওপিটি।

  • এবার চলতি ভরা মৌসুমে ফের পদ্মার ব্যাপক ভাঙনের মুখে পড়ে বিলিন হতে চলেছে চর খানপুর বিওপিটিও। বিওপি থেকে আর মাত্র ১০-১২ গজ দূরে অবস্থান করছে ভয়াল পদ্মা। দেখে মনে হচ্ছে, এই বুঝি পদ্মা ছোবল দিয়ে সব গিলে খাবে।

গতকাল রবিবার সকালে পবার সীমান্তবর্তি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চারিদিকে শুধু ভাঙনের ছোবল। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই শুধু ভাঙন আর ভাঙন। যেন সর্বনাশা পদ্মা মরণ কামড় দিয়ে রেখেছে তার পাশের ভূমিগুলোতে। সবকিছু নামিয়ে নিতে চায় তার বুকে। আর এই মরণ ছবলে একে একে বিলিন হয়েছে বাড়ি-ঘর থেকে শুরু করে ফসলের মাঠ এমনকি সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী বিজিবি’র একটি বিওপি পর্যন্ত।
চর খানপুর বিওপি ক্যাম্পটির চারিদিকে শতশত মেহেগুনি, আম, পেয়ারা, শিশুসহ নানা প্রজাতির গাছে ভরা। গাছের সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে বিওপিটির ভিতরে যেন সূর্যের আলো পৌঁছাও দায়। সবুজেঘেরা মনোরম পরিবেশের মধ্যে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চর খানপুর বিওপিটি। কিন্তু পদ্মার ভয়াল থাবা এখন চোখ রাঙাচ্ছে এই বিওপিটির দিকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চর খানপুর বিওপি ক্যাম্পের একজন বিজিবি সদস্য সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘যেভাবে পদ্মা ভাঙছে, তাতে যে কোনো সময় বিলিন হয়ে যেতে পারে বিওপিটি। তাই এখানে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

  • স্থানীয় চর খিদিরপুরের বাসীন্দা আজমত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নদী যেভাবে ভাঙছে, এভাবে চলতে থাকলে চর খিদিরপুর বিওপি ক্যাম্প সরাতে হবে। তখন শুধু সরাতেই হবে না। ওই ক্যাম্পের সব তল্পি-তল্পা যা আছে, তা বান্দি নিয়ে ওপারে (এপারে নগরীতে) চলে যাতে হবি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র মতে, ২০১৩ সালে ভাঙনের সময় দুটি বিওপি রক্ষার জন্য সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয় করে পাউবো। কিন্তু রক্ষা করা যায়নি চরখিদিরপুর বিওপি ক্যাম্পটি। একদিকে বস্তা জলে ফেলা অবস্থায় অন্যদিকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছি গোটা বিওপিটিকে।

  • এবার সেই দশা হতে চলেছে চর খানপুর বিওপিটির। তবে এবার আর সেখানে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে না। সীমান্ত এলাকায় নতুন করে আর বাধও দেওয়া হবে না। ফলে বিলিন হয়ে যাবে পদ্মার অপারের বিশাল চর এলাকা।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান বলেন, ‘পবার সীমান্ত এলাকার তিনটি চর এলাকায় স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। দুই বছর মেয়াদ ধরে এ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা পাঠানো হয়। তবে সেটি পরে আর অনুমোদন না হওয়ায় বর্ষায় ভাঙছে চরের বিশাল ভূমিসহ বাড়ি-ঘর।

স্থানীয় বাসীন্দাদের দেওয়া তথ্য মতে, চর খিদিরপুর চর খানপুর ও চর মাঝাড় দিয়াড় এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ২০ হাজার মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া ছাড়াও এই এলাকার চোরাচালান প্রতিরোধে ভূমিকা রাখেন বিজিবি সদস্যরা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই এই সীমান্ত এলাকা ভেঙে চলেছে পদ্মার গ্রাসে। এবারও কয়েক শ বাড়ি-ঘরসহ শতশত বিঘা ফসলের জমি গেছে পানিতে তলিয়ে।

  • স্থানীয় হরিপুর উনিয়নের বাসিন্দা আবু আলম  জানান, ৬০-৭০ বছর ধরে পদ্মার তীরবর্তি চর খানপুরে বসবাস করছেন তাঁরা। বর্তমানে এখানকার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজারে। এসব মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ওই এলাকার পদ্মার চরের জমিতে ফসল ফলানো। কেউ জমির মালিক আবার কেউ শ্রমিক।

আবার অনেকেই আছেন চরে গরু-ছাগল পালন করেও জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে পদ্মার অব্যাহতে ভাঙনে এই চরটি এখন বিলিন হতে চলেছে। সেই সঙ্গে এখান মানুষ হারাতে বসেছে তাদের বসভিটাসহ ফসলি জমি।
স্থানীয় ছাইমুদ্দিন (৬২) নামের এক ব্যক্তি জানান, এরই মধ্যে পদ্মার ভাঙনে তাঁর প্রায় ৩০ বিঘা জমি বিলিন হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বাড়ির জায়গা পরিবর্তন করতে হয়েছে অন্তত ৮ বার। গত বর্ষায় মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বাড়ির জায়গা পরিবর্তন করতে হয়েছে তিন বার। এবার শেষ সম্বল মাত্র ১৫ কাঠার ওপরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
ছাইমুদ্দিন বলেন, ‘যেভাবে পদ্মা ভাঙছে-তাতে এবার মনে হয় আর রক্ষা নাই। এবার হয়তো সবই হারিয়ে পথে বসতে হবে। অথবা ছাড়তেই হবে বাবার আমলে জেগে উঠা এই চর এলাকাটি।’

স/আর