
সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক
সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের দুই ধাপ অবনতি ঘটেছে; ১২তম স্থান থেকে ১০তম স্থানে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। গত এক যুগের মধ্যে বাংলাদেশে দুর্নীতি এবারই সবচেয়ে বেশি, বলছে টিআইবি।

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইর দুর্নীতির ধারণাসূচক প্রতিবেদন (সিপিআই)-২০২৩ মঙ্গলবার বিশ্বজুড়ে একই সময়ে প্রকাশিত হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রতিবেদন তুলে ধরেন।
সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে ‘বিব্রতকর ও হতাশাজনক চিত্র’ মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, যে মেয়াদের (নভেম্বর-২০২২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৩) তথ্যের ওপর নির্ভর করে এই রিপোর্ট হয়েছে, সে সময়কালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণাসহ অন্য যেসব অঙ্গীকার ছিল, সেগুলো প্রতিপালন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, সরকারি খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। এ মেয়াদে বিশেষ করে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা দেখা গেছে।
সূচকে বাংলাদেশের সমান স্কোর করা অন্য চারটি দেশ হচ্ছে- আফ্রিকান রিপাবলিক, ইরান, লেবানন ও জিম্বাবুয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে দুর্নীতির হার বেশি। ভুটান আগের বছরের ৬৮ স্কোর ধরে রেখে ৫৩তম অবস্থানে রয়েছে; এছাড়া নেপাল ও পাকিস্তানের যথাক্রমে ১ ও ২ পয়েন্ট উন্নতি হয়ে রয়েছে ২১তম ও ১৫তম অবস্থানে। এদিকে শ্রীলঙ্কার ২ পয়েন্ট এবং মালদ্বীপ, ভারত ও বাংলাদেশের ১ পয়েন্ট কমেছে। সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শ্রীলঙ্কা ২০তম, ভারত ২৫তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ৬ নম্বর অবস্থানে আছে আফগানিস্তান।
সূচকে ১০০ স্কোরের মধ্যে ৯০ পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক। ৮৭ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ফিনল্যান্ড। আর সর্বাধিক দুর্নীতি হচ্ছে সোমালিয়ায়, দেশটির স্কোর মাত্র ১১; ১৩ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলা।
টিআই বলেছে, ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৪, যা গতবারের চেয়ে ২ পয়েন্ট কম। তালিকায় ১০০ স্কোরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর প্রাপ্তির ক্রমানুসারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম। আগের বছর (২০২২) ১৪৭তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। এর আগে ২০২২ সালে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২তম। সেবার বাংলাদেশের স্কোর ১ পয়েন্ট কমে ২৬ থেকে ২৫ হয়েছিল।
২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র এই প্রতিবেদনে তুলে ধরে বলা হয়, সিপিআই সূচকে দুর্নীতির ধারণার মাত্রাকে ০ থেকে ১০০-এর স্কেলে নির্ধারণ করা হয়। ‘০’ স্কোরকে দুর্নীতির কারণে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ‘১০০’ স্কোরকে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত বা সর্বাধিক সুশাসিত বলে ধরা হয়।
দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যেসব ব্যবস্থা আছে, সেগুলো অপবির্তিত রয়েছে মন্তব্য করে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) এবং জ্যেষ্ঠ জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘দুর্নীতি করবার যে পথগুলো, সেগুলো অবারিতই আছে, বন্ধ করা হয়নি। এ কারণে আমাদের অবস্থারও পরিবর্তন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দুদকের প্রচেষ্টা খুব ফলপ্রসূ নয়। দুর্নীতির দায়ে গত এক বছরে আদালতে তেমন একটা সাজা যে হয়েছে, তা বলা যায় না।
এ মেয়াদেও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে উল্লেখ করে টিআইবির র্নির্বাহী পরিচালক বলেন, ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। বলা হয়েছিল, যারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার করছেন, তাদের জবাবদিহিতায় আনতে হবে। কিন্তু দেখা গেছে, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, যেগুলোর হাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, সেগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে; প্রভাব বিস্তারও করা হয়- এ মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর ফলে যারা দুর্নীতি করেন তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, প্রমোট করা হয়। বিশেষ করে যারা ক্ষমতাবান, তারা সুরক্ষা পান বা বিচারহীনতা ভোগ করেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এটা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, উল্লেখিত মেয়াদে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতি অবারিত থেকেছে এবং ঘুষ লেনদেন বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি অফিসে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যও বিদ্যমান আছে। স্বজনপ্রীতি বা দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবে সরকারি খাতে নিয়োগ থেকে শুরু করে নানা পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। জবাবদিহিতার পরিবর্তে উল্টো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, এমনকি পুরস্কৃতও করা হয়েছে।
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, সরকারি ও রাজনৈতিক অবস্থানের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের যে সংস্কৃতি, সেটাকে একটা ‘লাইসেন্সের’ মতো বিবেচনা করা হয়েছে। এ দশার উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তাদের অবস্থান ও পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ইশতিহারে সুনির্দিষ্টভাবে দুর্নীতিবিরোধী অনেকগুলো অঙ্গীকার করা হয়েছে। এসব অঙ্গীকার যেন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, এটা আমাদের অন্যতম সুপারিশ। এর মাধ্যমে দুর্নীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ-মুক্ত করার দাবি জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাজনৈতিক ও নির্বাহী ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি বলেন, টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেটির কার্যকর প্রয়োগ তারা করতে পারেনি। তার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে- প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুদকের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল, আছে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, যখনই রাষ্ট্রীয় বিষয় বা দুর্নীতি নিয়ে বা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা হয়, আপনারা লক্ষ্য করবেন তাদের মানসিকতা অনেকটা প্রতিরক্ষামূলক হয়ে থাকে। সরকার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তারা জনগণকেই সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে। তাদের ক্ষমতার উৎসটা আসলে তারা অন্য জায়গায় দেখেন, জনগণের মধ্যে দেখেন না- এটা আমাদের ধারণা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শেখ মনজুর-ই-আলম, সমন্বয়ক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
এদিকে এশিয়ার মধ্যে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ৪ নম্বরে আছে- টিআইবির এমন তথ্যসহ তুলে ধরা প্রতিবেদনের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, টিআইবি তো বিএনপির দালাল। বিএনপি যা বলে, টিআইবিও তা বলে। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু রাজনৈতিক ইন্টারেস্ট (স্বার্থ) আছে। বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার যে দ্বন্দ্ব, সেখানে অবস্থানগতভাবে কোনো কোনো জোট বা দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের পাহারাদার এসব প্রতিষ্ঠান। ওখানে কারও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এসব কমেন্ট (মন্তব্য) করা হয়। এসব অপবাদ দেওয়া হয়। এটা অতীতেও দেওয়া হয়েছে।








