আন্তর্জাতিক

ইরানে বিক্ষোভে ২০০০ নিহত

নিউজ ডেস্ক১৪ জানুয়ারি ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান এত বড় মাপের ধাক্কা আর খায়নি। স্থানীয় মুদ্রার নজিরবিহীন দরপতনে সৃষ্ট গণবিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের একজন সরকারি কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন। তবে বিবিসির পার্সিয়ান সংবাদদাতা জিয়ার গোল বিবিসিকে বলেছেন, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে অভিযানে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি বলেছেন, ‘ইরান সরকার আগেও শক্তি প্রয়োগ করেছে, কিন্তু এবারে যা ঘটছে তা একেবারেই নজিরবিহীন।’ সরকারিভাবে ইরান এখনো এই বিষয়ে মুখ খোলেনি।
এদিকে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তাদেরকে রাজপথে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাহায্য আসছে বলে তাদেরকে আশ্বস্তও করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিন। হত্যাকারী ও নিপীড়কদের নাম সংরক্ষণ করুন। তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

’
দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী অস্থিরতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পর এই প্রথম অজ্ঞাতপরিচয় একজন সরকারি কর্মকর্তা এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করল। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে ওই ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা কর্মী উভয় পক্ষের মৃত্যুর পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ মানুষ আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে এটি ইরানের কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক আর্থিক কর্মসূচির কারণে ইরান এমনিতেই তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে হওয়া প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে ‘বৈধ’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে অত্যন্ত কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করছে। ইরান সরকার এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে বলেছে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীরা’ এই আন্দোলনকে দখল করে নিয়েছে।
গত এক সপ্তাহে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে রাতের বেলা সংঘর্ষের বেশ কিছু ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব ভিডিওতে গোলাগুলি, গাড়ি ও ভবনে অগ্নিসংযোগসহ সহিংস সংঘাতের চিত্র দেখা গেছে। এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স জেনেভায় এক সম্মেলনে বলেছেন, ‘রিপোর্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজার হাজার আটক হয়েছে।’

গত ২৮ ডিসেম্বর, রাজধানী তেহরানের কয়েকটি বাজারে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ছোট ছোট বিক্ষোভ থেকেই ইরানে বিক্ষোভের শুরু। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে। মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের দরপতন—সব মিলিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণ জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামতে থাকে লাগাতার। ইরান সরকার এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। তারা বলছে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীরা’ এই আন্দোলনকে দখল করে নিয়েছে।

এটা স্পষ্ট, ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির প্রশাসন। তবে এই দমন-পীড়ন চললে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ গণবিক্ষোভের মুখে পড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খোদ ইরানের একজন সংসদ সদস্য। গতকাল ইরানের পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে ইয়াজদ প্রদেশের প্রতিনিধি মোহাম্মদ রেজা সাবাঘিয়ান বলেন, ‘মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। সরকার ও পার্লামেন্টের কর্মকর্তাদের উচিত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা। অন্যথায় একই ধরনের ঘটনা আরো তীব্রভাবে ফিরে আসবে।’ আর ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, তাঁরা ‘সেল সদস্যদের’ দ্বারা লুকানো মার্কিন অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দ করেছে। বেইজিং ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, তারা ‘যেকোনো অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘমেয়াদি এখতিয়ারের দৃঢ় বিরোধিতা করে।’ তবে ফিনল্যান্ড, স্পেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলো বিক্ষোভের ওপর ইরানের দমন-পীড়নের সমালোচনা করেছে।

মঙ্গলবার থেকে ইরানে আন্তর্জাতিক ফোন কল পরিষেবা আংশিক চালু হলেও ইন্টারনেট এবং মেসেজিং পরিষেবা এখনো অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বা দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে।

এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের অভিযান চালাবে সে ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তা। তাঁরা বলেছেন, ইরানে হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে দূরপাল্লার মিসাইল ছোড়ার পাশাপাশি সাইবার হামলা ও মনস্তাত্ত্বিক ক্যাম্পেইন চালানোর পরিকল্পনা ট্রাম্পের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।

এরই মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প সোমবার ঘোষণা দিয়েছেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করবে তাদের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বিবিসি জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে কী করা হবে এ ব্যাপারে মঙ্গলবার আলোচনায় বসবেন হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা। তবে এ আলোচনায় ট্রাম্প উপস্থিত থাকবেন কি না সেটি স্পষ্ট নয়।

এদিকে জাপানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজি এর কমোডিটিস কৌশলবিদরা জানিয়েছেন, ইরানজুড়ে বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার পর থেকেই তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে অস্থিরতা আরো বৃদ্ধি পেলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটতে পারে। ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বার্কলেস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইরানে চলমান অস্থিরতার কারণে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় তিন থেকে চার ডলার বেড়েছে।’ সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, আলজাজিরা, আনাদোলু