রাজশাহী

অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ী রিতার অপেক্ষায় দুর্গাপুরবাসী

নিউজ ডেস্ক২৪ আগস্ট ২০১৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রিও অলিম্পিকে এবারের আসরে রিদমিক জিমন্যাস্টিকস এ সোনাজয়ী মার্গারিটা (রিতা) মামুনের গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুরে বইছে আনন্দের জোয়ার। রাশিয়ার বংশদ্ভুত রিতার জন্য ক্ষিদ্রকাশিপুরে গ্রামজুড়ে অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ মানুষ। ছোট বেলা বাবার সঙ্গে বেড়াতে এসে এই গ্রামেই কিছুদিন কাটিয়েও গেছেন রিতা। তাই তার প্রতি ভালোবাসা যেন এখনো রয়ে গেছে পাড়া-প্রতিবেশীদের।

160822122228_bangladesh_bangla_russian_gymnast_margarita_mamun_in_olympic_640x360_gettyimages_nocredit

রিতার শৈল্পিক প্রদর্শনী দেখতে গভীর রাত জেগেও অপেক্ষা করেছেন গাঁয়ের লোকজন। রাশিয়ার হয়ে অলিম্পিকে যে রিতা স্বর্ণ জয় করলেন, তিনি তো বাংলাদেশরই হতে পারতেন। বাংলাদেশ সরকারের ভুলের কারণে আজ হয়তো রিতা রাশিয়ার স্বর্ণজয়ী মেয়ে। কিন্তু তার বাবার দেশ অনুযায়ী রিতা বাংলাদেশরই একজন উজ্জল নক্ষত্র হতে পারতেন।
ক্ষিদ্রকাশিপুর গ্রামে রয়েছে মামুনের বাবার তৈরী করা একটি পুরনো মাটির বাড়ি। ওই বাড়ির পাশে মামুন ২০-২৫ বছর আগে একতলা ফ্লাট বাড়ি তৈরী করেছেন। এবাড়িতে প্রতিবছরই মামুন স্ব-পরিবার নিয়ে এসে থাকতেন। এর মধ্যে কন্যা রিতা এসেছেন তিনবার। কিন্তু দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত তিন বছর ধরে আর বাড়িতে আসতে পারছেন না মামুন। রিতা সর্বশেষ এসেছে প্রায় আট বছর আগে। তখন তিনি ছোট ছিলেন।

e0a6aee0a6bee0a6b0e0a78de0a697e0a6bee0a6b0e0a6bfe0a69fe0a6be1
রিতা স্বর্ণজয় করার পর রাজশাহী-৬ আসনের এমপি ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ‘মার্গারিটা মামুন রিদমিক জিমন্যাস্টিকসে প্রথম হয়ে স্বর্ণ জিতেছে। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার পিতা বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে যোগাযোগ করেছিলেন। তার মেয়েকে বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করানোর জন্য। কিন্তু তখনকার প্রশাসন আগ্রহ প্রকাশ করেনি। যাই হোক তবুও আমরা তার এ অর্জনে আনন্দিত তো হতেই পারি।’
এলাকাবাসী ও পরিবারের লোকজনও সেই দাবি করেছেন।

 

  • তাঁরা বলেছেন, রিতা বাংলাদেশের হয়েই অলিম্পিক আসরসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিক-তা তার বাবার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ব্যর্থতার কারণে মামুনের আর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে মামুন শ্বশুরের দেশ বা রিতার জন্মভূমি রাশিয়ার হয়েই অলিম্পকে অংশ নিচ্ছেন। আর এবার তিনি রাশিয়ার মুখ উজ্জল করে ছিনিয়ে নিয়েছেন রিদমিক জিমন্যাস্টিকে স্বর্ণ।

 

এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্র মতে, মার্গারিটার গ্রামের বাড়ির রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ক্ষিদ্রকাশিপুর গ্রামে। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রামটির সন্তান আব্দুল্লাহ আল মামুনের মেয়ে মার্গারিটা। তবে গ্রামে তিনি পরিচিত শিপার নামে। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মামুন।
মামুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, আব্দুল্লাহ আল মামুন দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্টিক পাশ করে তিনি একাদশ শ্রেণীতে ভর্র্তি হন রাজশাহী কলেজে। এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে।

 

  • এরপর শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে ১৯৮৩ সালে রাশিয়ায় চলে যান মামুন। সেখানে গিয়ে বিয়ে করেন রুশ কন্যা আন্নাকে। মামুন- আন্না দম্পত্তির  ঘরে ১৯৯৫ সালের ১ নভেম্বর মস্কোতে জন্ম নেন কন্যা মার্গারিটা। পরে তারা পুত্র ফিলিপ আল মামুনকেও জন্ম দেন।

মামুনের বোনের ছেলে ও শামসুজ্জোহা বলেন, ‘রিতা যখন ছোট ছিলো তখন তার বাবা চেয়েছিলেন রিতা বাংলাদেশের হয়ে অলিম্পিকে খেলবে। এজন্য তিনি তত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশের অলিম্পিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। কিন্তু তারা আগ্রহ দেখাননি। ফলে রাশিয়ার হয়েই তাঁকে অংশ নিতে হলো।’

 

অথচ রিতার বাবার বাড়ি এই বাংলাদেশেই। সেই হিসেবে রিতাও বাংলাদেশি কন্যা। আমরা এখনো আশা রাখি আগামী অলিম্পিক আসরে (জাপানে অনুষ্ঠিত হবে) রিতা বাংলাদেশের হয়েই অংশ নিক। এজন্য দেশের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখালে রিতা খেলতে আপত্তি করবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তার ফুফাতো ভাই শামসুজ্জোহা।
তিনি বলেন, রিতা বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিক এটা তাঁর বাবার স্বপ্ন। তাই তার আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে দ্রুতই বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

160822122600_bangladesh_bangla_russian_gymnast_margarita_mamun_in_olympic_640x360_gettyimages_nocredit
শামসুজ্জোহা আরো বলেন, ‘রাশিয়ার হয়ে রিতা স্বর্ণ জিতলেও তার জন্য এখনো পথ চেয়ে বসে আছে ক্ষিদ্রকাশিপুরের গ্রামবাসী। স্বর্ণজয়ের খবর শুনে তার গ্রামের বাড়িতে এখন লোকজন ছুটে আসছে। নারী-পুরুষ সবাই আসছেন রিতার বাড়িতে।

  • মামুনের বোন দিনা জহুরা বলেন, মামুনের স্ত্রী আন্নাকে যখন এদেশে প্রথম নিয়ে আসে তখন তাকে মৌলবী ডেকে কালেমা পড়িয়ে মুসলিম করা হয়। এরপর তাদের আবারো বিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামেই হয় তাদের বিয়ের উৎসব।

 

রিতা (মার্গারিটা মামুন) এ পর্যন্ত তিনবার গ্রামে এসেছে। সে ভাঙ্গাভাঙ্গা বাংলা বলতে পারে। রিতা আমার গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খেতো। ফুপু বলে ডাকতো। সব সময় কোলে উঠে জড়িয়ে থাকতে পছন্দ করতো। আদর করতো। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে ব্যস্ত ছিলো। সুযোগ পেলেই পুকুরের বাঁধানো ঘাটে এসে বসে থাকতো। তার বাবা মামুন মেয়ে রিতাকে বলতো, ‘এটাই তোমার আসল বাড়ি। তুমি এখানে আসবে।’

160822123009_bangladesh_bangla_russian_gymnast_margarita_mamun_in_olympic_640x360_gettyimages_nocredit
গ্রামের বাসিন্দা হযরত আলী বলেন, ‘রিতা যেদিন স্বর্ণ জয় করে তার আগেই জেনেছি, সে আজ খেলবে। তাই রাত জেগেও তার খেলা দেখেছি। কি যাদুময় রিতার খেলা। এমন একটি যাদুময়ী মেয়ে যদি আমাদের দেশের হয়ে খেলতো তা হলে আমাদের মতো সারাদেশই তার জন্য গর্ববোধ করতো। তারপরেও রিতা আমাদের গ্রামের মুখ উজ্জল করেছে ভেবে খুব ভাল লাগছে। আমরা গর্বিত তার বাবা মামুন এবং তার মেয়ে রিতার এই অসাধারণ বিজয়ের জন্য।’
দুর্গাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রিতা আমাদের দুর্গাপুরবাসীসহ গোটা বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করেছে। তার জন্য গোটা দুর্গাপুরবাসী আনন্দিত গর্বিত। শুনেছি সে বাংলাদেশে আসবে। আসলে দুর্গাপুর বাসীর পক্ষ থেকে তাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানানো হবে। আমরা তার জন্য অপেক্ষায় আছি।’

স/আর