রাজশাহী

রামেক হাসপাতালের আইসিইউতে : ১৮ দিনে শয্যা না পেয়ে অর্ধশত শিশুর মত্যৃ

নিউজ ডেস্ক২৯ মার্চ ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘আমার বাচ্চা ২১ দিন রাজশাহী হাসপাতা ভর্তি ছিলো। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছিল। বাচ্চাকে আইসিইউতে ভর্তি করার জন্য বলেছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু টানা দুইদিন অপেক্ষা করেও বাচ্চাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আমি বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়।

কিন্তু তার পরে আর বাঁচানো যায়নি। রাজশাহী হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করার পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিনই মারা যায় আমার শিশুটি। আগেই যদি রাজশাহী হাসপাতালে আইসিউতে ভর্তি করা যেত তাহলে হয়তো আজকে এমন কঠিন দিনের মুখে পড়তে হতো না আমাকে। সন্তান হারা হয়ে আমি আমাকে কোনোভাবেই বুঝ দিতে পারছি না। একটা আইসিইউ বেডের জন্য আমার বাচ্চাটি মারা গেল।’ এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, চাঁপাইনবাবগঞ…
মৃত্যুর দুইদিন পরে আইসিইউতে ভর্তির ফোন পান আনাসের বাবা:
জ¦র আর ডায়রিয়া আক্রান্ত চার মাস বয়সী আনাসকে গত ১৩ মার্চ ভর্তি করা হয়েছিল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। টানা তিনদিন চিকিৎসা শেষেও আনাসের শরীরের অবস্থার উন্নতি না দেখে তাকে হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু আনাসের বাবা শামির উদ্দিন আইসিইউ;র রিসিপশনে গিয়ে দেখেন তার আগে আরও ৩৮ জন শিশু আছে অপেক্ষামান তালিকায়।

আনাস ভর্তি করাতে হলে ৩৮ জনের পরে ৩৯ নম্বরে সিরিয়ালে ভর্তি করাতে হবে। ফলে টানা দুইদিন অপেক্ষা করেন আনাসের বাবা। তার পরেও আইসিইউ মেলেনি। শেষ পর্যন্ত গত ১৫ মার্চ আনাস মারা গেলে মরদেহ নিয়ে শিশুটির বাবা তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নিয়ে যান। এর পর ১৭ মার্চ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ থেকে ফোন করে বলা হয়, বেড (শয্যা) ফাঁকা হয়েছে আনাসকে নিয়ে আসেন।’

আনাসের বাবা শামির উদ্দিন গতকাল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার তিন মেয়ের পরে একটা ছেলে হয়েছিল। তাও বাঁচাতে পারলাম না। বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ না পেয়ে শ^াসকষ্টে আমার বাচ্চাটি মারায় গেল। ছেলের আশা আর পূরণ হলো না।’

রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সাহিদের শিশুসন্তান নাহিদ ১৩ মার্চ এই হাসপাতালে মারা গেছে। তার বাবা সাহিদ বলেন, আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসক পরামর্শ দেওয়ার তিন দিন পর তাঁর ছেলে মারা যায়। এই তিন দিনে চেষ্টা করেও ছেলেকে আইসিইউতে নিতে পারিনি।

শিশু আইসিইউ’র সামনে উৎকণ্ঠায় অভিভাবকদের অভিভাবকদের ভিড়:
গতকাল বিকেলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউ’র সামনে গিয়ে দেখা যায় কয়েকজন অভিভাবক উৎকণ্ঠা ও হতাশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আইসিইউ’র সামনে দাঁড়িয়েই আছেন থ মেরে। আবার কেউ সিরিয়াল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ওয়ার্ডের দিকে চলে যাচ্ছেন চিকিৎসাধীন শিশুর কাছে।

কুষ্টিয়ার মীরপুর থেকে ১০ মাস বয়সী শিশু সন্তান সাফোয়ানকে নিয়ে গতকাল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন তার পরিবারের লোকজন।

শ^াসকষ্ট ও হাম রোগে আক্রান্ত সাফোয়ানের অবস্থা বেগতিক দেখে ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা সাফোয়ানকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। বিকেল ৫টার দিকে সাফোয়ানের বাবা আইসিইউতে গিয়ে দেখেন সাফোয়ানের আগে আরও ৪১ টি শিশু অপেক্ষায় আছে ভর্তি হওয়ার জন্য।

সাফোয়ানের বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেকে এখনোই আইসিইউতে নেয়া দরকার। কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ ফাঁকা নাই। আমাদের আগে আরও ৪১ জন শিশু আছে। কখন ওই শিশুরা ভর্তি হবে। তার পরে আমার শিশুকে ভর্তি করাতে পারব। আমাদের এতো টাকাও নাই যে ঢাকায় নিয়ে যাবো। এখন কি করবো?’
একই অবস্থা ৪২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা সাত মাস বয়সি শিশু মোজাহিদের পরিবারের সদস্যদের। উৎকণ্ঠা নিয়ে শিশু আইসিইউ’র সামনে অপেক্ষায় ছিলেন শিশুটির বাবা কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার মোস্তাক হোসেন।
তিনি বলেন, ‘গতকাল বাচ্চাকে শ^াসকষ্টজনিত কারণে নিয়ে এসেছি এখানে। আজকে বিকেলে চিকিৎসকরা ছেলেকে আইসিইউতে নিতে বলেছি। এসে দেখি ৪২ নম্বর সিরিয়াল পড়েছে। এতো শিশুর পরে কিভাবে ভর্তি করাবো আমার বাচ্চাকে। হয়তো বাঁচানোই যাবে না ততক্ষণে।’
আইসিইউ’র অপ্রতুল শয্যা:
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ সূত্র মতে, জটিল, সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ বিশেষায়িত আইসিইউ সেবার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি পর্যায়ের খরচ অনেক বেশি। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত রোগীদে বেসরকারী হাসাপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে পরিবারের পক্ষে। তবে আইসিইউ সংকটের কারণে সরকারি ও বেসরকারি কোনোটাতে সহজে পাওয়া যায় না শয্যা।
রামেক সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শয্যা ৪০ ও শিশুদের ২০টি। কিন্তু এটি সরকারের অনুমোদন পায়নি। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মোট ৪০টি শয্যায় চিকিৎসা দিচ্ছে। এর মধ্যে যুবকদের ১২টি, বয়স্কদের ১৬ ও শিশুদের জন্য ১২টি শয্যা ব্যবহার করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সরবরাহ না করায় শিশুদের ২০টি শয্যা চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু শিশুদেরই আইসিইউর চাহিদা অনেক বেশি থাকছে।

রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, রাজশাহী মেডিকেলে বর্তমানে ৪০ শয্যার যে আইসিইউ চলছে, সেটা সরকার অনুমোদিত নয়। সম্পূর্ণ হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এটি চালানো হয়। এখানে সরকার একজনকেও নিয়োগ দেয়নি। হাসাপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আইসিইউ চালানো হচ্ছে।