রাজশাহী

নিয়োগের নীতিমালা মানেন না রামেবি ভিসি

নিউজ ডেস্ক৮ মার্চ ২০২৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক কর্মকর্তা নিয়োগের কোনো নীতিমালা মানেন না। যাকে যে পদে খুশি তিনি বসিয়ে দেন। এ জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মো. ইব্রাহিম কবীর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেছেন। শনিবার (৭ মার্চ) তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন রেজিস্ট্রার ডা. মো. হাসিবুল হোসেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ভিসি ডা. জাওয়াদুল হক আগে রামেবির কলেজ পরিদর্শক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ডীনসহ একইসঙ্গে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ওই সময় তাঁর সুপারিশে ২০১৮ সালে প্রথম অস্থায়ীভাবে পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ইব্রাহিম কবীর। শিক্ষাজীবনে কোনো তৃতীয় বিভাগ এই পদে চাকরির অযোগ্যতা। তারপরও ইব্রাহিম কবীর নিয়োগ পেয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে বিষয়টি তৎকালীন রেজিস্ট্রার ড. মো. খালেদের নজরে এলে তার চাকরি চলে যায়।

পরে ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর রামেবির ভিসি হন ডা. জাওয়াদুল হক। তিনি আবার পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে ইব্রাহিম কবীরকে নিয়োগ দেন। সম্প্রতি তাঁর নিয়োগ নিয়ে আবার বিতর্ক সামনে আসে। এ অবস্থায় ২৬ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।

নিয়োগে হ-য-ব-র-ল:

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসি জাওয়াদুল হক কর্মকর্তা নিয়োগের কোনো নীতিমালাই মানছেন না। নীতিমালা লঙ্ঘন করে তিনি শুধু ইব্রাহিম কবীরকেই নিয়োগ দেননি, অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন রেজিস্ট্রার হাসিবুল হোসেন, কলেজ পরিদর্শক আবদুস সালাম, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাহ আলম, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) নজিবুর রহমান, উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) আশরাফুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন। নীতিমালা লঙ্ঘন করে ভিসি তাদের নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রামেবির একাধিক কর্মকর্তা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), এবং পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে একটি নীতিমালা করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এতে বলা হয়েছে, স্থায়ী নিয়োগের জন্য অন্তত দুইবার জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও যদি উপযুক্ত জনবল না পাওয়া যায়, তবেই সিন্ডিকেট চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি পদের জন্য যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে ইউজিসি থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটিতে ইউজিসি চেয়ারম্যানের মনোনীত একজন প্রতিনিধিও থাকতে হবে।

এই নীতিমালা অনুসরণ না করে ভিসি নিয়োগ দিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১৬ দেখিয়ে। এ আইনের ধারা ১৩ এর উপধারা ১০ এ বলা আছে, ভিসি শিক্ষক, প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর ও কোষাধ্যক্ষ বাদে অন্য পদে ছয় মাসের জন্য সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে পারবেন। প্রয়োজনে নিয়োগের মেয়াদ আরও ছয়মাস বাড়াতে পারবেন। কিন্তু বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে নিয়োগ নিয়মিত করা না হইলে ওই মেয়াদ শেষে নিয়োগ বাতিল বলে গণ্য হবে। কিন্তু ভিসির নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরিতে আছেন।

নিয়োগে নীতিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগে গত বছরের ২৩ নভেম্বর রামেবি উপাচার্যসহ ছয়জনকে আইনজীবীর মাধ্যমে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন আব্দুল মাজেদ নামের এক ব্যক্তি। চাকরিপ্রত্যাশী মাজেদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার আটিয়াতলী গ্রামে। লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়েছে, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, অস্থায়ী নিয়োগের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৬ মাস এবং প্রয়োজনে আরও ৬ মাস বৃদ্ধি করা যায়। এর বাইরে সময় বৃদ্ধির আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু রামেবিতে সেটি করা হয়েছে। ভিসির নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে শুধু প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামের চাকরির মেয়াদ এক বছর হয়নি। অন্য সবাই এক বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিতর্কিত অস্থায়ী নিয়োগকাণ্ডের পর ইউজিসি সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দিয়ে অস্থায়ী নিয়োগ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু রামেবি ভিসি সেই নির্দেশনাও মানেননি। তিনি রামেবির অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগের আইন দেখিয়ে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন।

আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম রয়েছে নিয়োগ বোর্ড গঠন করার। এক্ষেত্রে ইউজিসির অনুমোদনের পর নিয়োগ বোর্ডে ভিসি আহ্বায়ক ও রেজিস্ট্রার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আর নিয়োগ বোর্ডে থাকবেন ইউজিসির প্রতিনিধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নূন্যতম যুগ্ম সচিবের পদমর্যাদার প্রতিনিধি, বিষয় বিশেষজ্ঞ ও অধিভুক্ত কোনো কলেজের অধ্যক্ষ। এসব নিয়মের কিছুই মানা হয়নি। শুধু একটি সিভি নিয়ে ভিসি এর ওপরে পদ উল্লেখ করে লিখে দিয়েছেন নিয়োগ দেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভিসি এ কাণ্ড করেছেন বলে অভিযোগ।

বিতর্ক উঠলেই অব্যাহতি:

অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক ভিসি হওয়ার পর তিনি উপ-রেজিস্ট্রার পদে মফিজ উদ্দিন নামের একজনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এই পদের জন্যও শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ চাকরির অযোগ্যতা। মফিজ উদ্দিনের তৃতীয় বিভাগ থাকলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে বিতর্ক উঠলে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
একইভাবে তৃতীয় বিভাগ থাকা স্বত্ত্বেও পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পতে মো. ইব্রাহিম কবীরকে নিয়োগ দেন ভিসি। বিতর্ক উঠলে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। শনিবার তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন রেজিস্ট্রার। আগামী ১ এপ্রিল তার অব্যাহতি কার্যকর হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম কবীর বলেন, ‘আমি অবসর নিয়ে ছেলে মেয়েদের কাছে অস্ট্রেলিয়া চলে গিয়েছিলাম। এই ভিসি আমাকে ডেকে এনে যোগদান করালেন। এখন এতদিন পর আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমি আর বেশি কিছু বলতে চাই না। আমার এসব ভালো লাগে না। আমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেছে।’

জানতে চাইলে ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘ওনার একটা থার্ড ডিভিশন ছিল। এ জন্য সমালোচনা হয়েছে। তার সম্পর্কে একটু বিতর্ক আসছিল। স্বাভাবিক, এটা হলে তো ওনাকে ইয়ে দিতে হবে; তা না হলে আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। আমাদেরও সতর্ক হওয়া উচিত।’

এই নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো চাকরি না, এটাকে চুক্তি বলে; ৬ মাসের জন্য। অভিজ্ঞ লোকের দরকার হলে আমরা এভাবে নিয়োগ দেই। সবগুলো এভাবেই নিয়োগ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম থেকেই এভাবেই চলছে।’

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি বলে স্বীকার করেছেন ভিসি। তিনি বলেন, বায়োডাটা ও ইন্টারভিউ নিয়ে তিনজনের বা পাঁচজনের একটা কমিটি করে আমরা নিয়েছি। ইব্রাহিম কবীরেরও একটা ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছিল। কোনোভাবেই নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি।

ভিসি বলেন, ‘অস্থায়ী নিয়োগের জন্য প্রথমে বয়সসীমা উল্লেখ করে দুইবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। আমি আসার আগে দুইবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, সেখানে কিন্তু লোক পাওয়া যায়নি। তাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছি। থার্ড টাইমও আমি একটা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রেখেছি। তখন যদি কোয়ালিফায়েড লোক পাই, তাহলে সমস্যা থাকবে না।’

স.আর