বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রেললাইনে আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাপানের বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান!

নিউজ ডেস্ক১৭ জানুয়ারি ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রেললাইন ও ট্রেন স্টেশনগুলো বরাবরই বড় একটি সমস্যা। এই কারণেই বিশ্বের আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা জাপানের দিকে আলাদা করে নজর দিচ্ছেন। রেললাইনসংক্রান্ত আত্মহত্যা কমানোর ক্ষেত্রে জাপান ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

এই সমস্যার সমাধানে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে জাপান সরকার।

কোথাও রেললাইন উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে রাস্তার সমতলে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার বন্ধ হয়। কোথাও বসানো হয়েছে বিশেষ ‘জেড-গেট’, যেখানে ট্র্যাকের কাছে যেতে হলে ঘুরপথে যেতে হয়। ফলে হঠাৎ ট্রেনলাইনে ঝাঁপ দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। আবার সাবওয়ে স্টেশনগুলোতে স্বচ্ছ স্লাইডিং দরজা বসানো হয়েছে।

যেগুলো ট্রেন না থাকলে বন্ধ থাকে এবং ট্রেন এলে তবেই খুলে যায়।
এর বাইরেও কিছু অভিনব ধারণা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেমন—ট্রেনের সামনে এয়ারব্যাগ বসানো। আগে ট্রেনের সামনে এমন যন্ত্র থাকত, যা গবাদিপশুকে সরিয়ে দিত।

এখন সেই জায়গায় এমন ব্যাগ বসানো হয়েছে, যা কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে ফুলে উঠে আঘাতের ভয়াবহতা কমিয়ে দেয়।

তবে সবচেয়ে আলোচিত ও কার্যকর উদ্যোগগুলোর একটি হলো মুড লাইটিং বা বিশেষ আলো ব্যবহার। জাপানের কয়েকটি স্টেশনে প্ল্যাটফর্মে নীল আলো বসানো হয়। কারণ, নীল রংকে শান্ত ও প্রশান্তির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, যা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক।

২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে রেললাইনে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পর ইস্ট জাপান রেলওয়ে কম্পানি ইয়ামানোতে লাইনের সব স্টেশনে এই নীল আলো বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এই আলো বসানো হয়েছে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে, যে জায়গাগুলো সাধারণত নির্জন এবং যেখানে আত্মহত্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সাধারণ আলোর চেয়ে এগুলো উজ্জ্বল এবং পুরো প্ল্যাটফর্মকে নীল আভায় ঢেকে দেয়।

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব স্টেশনে এই আলো বসানো হয়েছে, সেখানে এক দশকে আত্মহত্যার চেষ্টা প্রায় ৮৪ শতাংশ কমে গেছে।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, কয়েকদিন টানা মেঘলা বা বৃষ্টির পর রেললাইনে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ে। শিগা ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সের গবেষকরা শত শত ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সম্পর্কটি খুঁজে পান। তাদের মতে, সূর্যালোকের অভাব মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নীল বা উজ্জ্বল আলো ব্যবহার বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে যখন টানা রোদহীন দিনের পূর্বাভাস থাকে।

এই নীল আলো বসানোর খরচ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর প্রভাব বেশ বড়। ইয়ামানোতে লাইনে আলো বসাতে খরচ হয়েছে অল্প কয়েক লাখ ডলার মাত্র।

তবে জাপানের আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্যোগ এখানেই থেমে নেই। দেশটির বহু স্টেশনে ইতোমধ্যে উঁচু ব্যারিয়ার ও স্বয়ংক্রিয় গেট বসানো হয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে টোকিওর সব স্টেশনে এই ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে খরচ অনেক বেশি হলেও কর্তৃপক্ষ মনে করে, মানুষের জীবন বাঁচানো এবং ট্রেন চলাচলের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার জন্য এই বিনিয়োগ জরুরি।

স্টেশনে আত্মহত্যার ঘটনা শুধু মানবিক ক্ষতিই নয়, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। এতে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয় এবং হাজার হাজার যাত্রীর দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। সে জন্য এই নীল আলো হতে পারে কার্যকর একটি পদ্ধতি।

সূত্র : সাইকোলজি টুডে