নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর বানেশ্বর হাটে গতকাল বৃহস্পতিবার এক মণ ফজলি আম বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে। আর লখনা বিক্রি হয়েছে ৬০০-এক হাজার টাকায়। এ দরে আম বিক্রি করে চাষিদের খরচের টাকায় উঠছে না বলে দাবি করেছেন তাঁরা। কিন্তু গাছেও আম রাখতে পারছে না।
গত কয়েকদিন ধরে মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি হলেও গরম ও পোক্ত হওয়ার কারণে গাছেই পেকে যাচ্ছে আম। আবার বৃষ্টির কারণে আমেও দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত পোকার আক্রমণ হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই দাম যায় হোক গাছ থেকে আম পেড়ে নিচ্ছেন কৃষকরা। এতে করে রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষিদের মাথায় যেন হাত পড়েছে এবার। যে লাভের আশায় স্বপ্ন বুনেছিলেন তাঁরা, এখন অনেক ব্যবসায়ীই লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন। অনেকেই দাম না পেয়ে অন্য ফসল চাষের জন্য গুটি, লখনা ও ফজলি জাতের আমের গাছ কেটে ফেলছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গোদাগাড়ী উপজেলার মাথাভঙ্গা এলাকার হাবিবুর রহমানের বাগানে এখনো থোকায় থোকায় ঝুলছে আম। কিছু আম গাছের গড়ায় পড়েও আছে। পড়া আমগুলোর কিছু পাখিতে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু পেকে পচে গেছে। কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই ২০-২৫টি একটি গাছ থেকেই ঝরে পড়লো মাটিতে। এর মধ্যে কিছু ছিল গাছপাকা; আবার কিছু হালকা পচা ছিল। আম্রপালি জাতের গাছপাকা আমগুলো খেতেও অনেক সুস্বাদু। তবে কয়েকটি আম কাটতেই ৩-৪টির ভিতর থেকে কিলবিল কওে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় সাদা রংয়ের পোকা। আবার কয়েকটি একেবারেই ভালো ছিল।
তিনি জানাচ্ছিলেন, একমণ আম (বাজার হিসেবে ৪৫-৪৮ কেজি) গাছ থেকে পাড়া থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত শ্রমিক ও পরিবহন খরচসহ সবমিলিয়ে অন্তত ৩০০-৩৫০ টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে সেই আম বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫শ টাকা দরে। কিন্তু গত বছর এই সময়ে সর্বনিম্ন অন্তত দেড় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছিল আম। এ বছর আবার একটু রং খারাপ হলেও আম নিতেই চাচ্ছেন না পাইকাররা। ৫-৭দিন আগে তো বাজাওে নিয়ে গিয়েও কালচে রংয়ের আম বিক্রি করা যায়নি। হাটেই ফেলে দিয়ে আসতে হয়েছে। বিশেষ করে ফজলি, লক্ষণভোগ ও গুটি (আঠি) জাতের আম কেনার যেন লোকই ছিল না। এবার শুরুতে ল্যাংড়া জাতের আম বিক্রি করতেও কষ্ট হয়েছে। ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। তবে এখন ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালিসহ ভালো জাতের আমগুলোর চাহিদা বেড়েছে। দামও কিছুটা বেড়েছে সেই সঙ্গে। যদিও রাজশাহীর বাজারে প্রায় শেষের দিকে ল্যাংড়া ও হিমসাগর জাতের আম। এ কারণে দাম কিছুটা বেড়েছে।
আকছেদ আলী বলেন, গুটি, ফজলি, লখনা আম নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। যারা বাগান লিজ (বন্ধক) নিয়ে আমচাষ করেছে তারা লোকসানের মুখে পড়িছে। যে বাগানে ফজলি, লখনা জাতের আম বেশি আছে, সে আমচাষি কোনোভাবেই এবার লাভ করতে পারবেন না। রাগে ক্ষোভে অনেকেই গাছই কেটে ফেলছে। আমি লিজেও ৩-৪ আঠি জাতের আমের গাছ কাটি খড়ি (লাকড়ি) হিসেবে বিক্রি করিছি। ’
গত কয়েকদিনে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট, বাঘাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে আমগাছ কেটে ফেলার একাধিক দৃশ্য দেখা গেছে। কেটে ফেলা বাগানগুলোতে অন্য ফষল ফলাবেন দাবি করেছেন বাঘার বাউশা এলাকার আফজাল হোসেন।
তিনি বলেন, এবার লখনা, ফজলি আর আঠি জাতের আম নিয়ে বিপদে পড়েছি। এসব আম তো বিক্রি করায় যেন দায়। বিক্রি হলেও বাজাওে নিয়ে গিয়ে অনেক সময় খরচের টেকায় উঠেনি। তাই এসব আমের গাছ কাটি ফেলছি। এখুন অন্য ফসল করবো।’
পুঠিয়ার জামিরা এলাকার ফুলবাস আলী জানান, খিরসাপাত, আম্রপালি, ল্যাংড়া, বারি ফোর জাতের আম যারা করেছেন তারা হয়তো কিছু লাভের মুখ দেখবেন। তবে খিরসাপাত ছাড়া দেশি জাতের আম যারাই চাষ করেছেন, তাঁরা কোনোভাবেই লাভ করতে পারবেন না। কারণ একজন শ্রমিক সর্বোচ্চ তিন মণ আম পাড়তে পারবে। সেই শ্রমিককেই দিতে হচ্ছে অন্তত ৫০০ টাকা। এর পর আছে গাড়ি ভাড়া, হাটের খাজনা, নষ্ট আম। তার পরিচর্যাসহ লিজ বা জমির খরচ হিসেব কষতে গেলে এখন দেশি জাতের আম বিক্রি করে সব চাষিকেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
জহিরুল নামের চারগাটের হলিদাগাছী গ্রামের এক আমচাষি জানান, বাগান পরিচর্যা, শ্রমিক খরচসহ আনুসঙ্গি আরও খরচ হয়। আবার শুরুতেই যে পরিমাণ আম ছিল এখন সেই আমও গাছে নাই। দাম না পাওয়ায় যারা বিক্রি করেননি তাদের বাগান থেকে এরই মধ্যে ঝরে পড়েছে অন্তত ৪০ ভাগ আম। গাছে যেগুলো আছে, গত ঈদের পর প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টির কারণে ব্যাপক পোকার আক্রমণ এবং পচন দেখা দিচ্ছে। ফলে একটা গাছ থেকে ৫ মণ আম নামানো হলে বিক্রির মতো বের হচ্ছে সর্বোচ্চ তিন মণ (৪৮-৫২ কেজিতে মণ)।
এ অবস্থায় আম বিক্রি করে তেমন লাভ হচ্ছে না চাষিদের। তবে একেবারে শেষের দিকে আসা হিমসাগর ও ল্যাংড়ার দাম দুই হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এ আম দুটির মধ্যে হিমসাগর রাজশাহীর বাগানগুলোতে তেমন নাই বললেই চলে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় আছে। রাজশাহীর বাজারে এখন বেশির ভাগ আমই আম্রপালি ও ফজলি জাতের। গতবারের মতো এবার আম্রপালির বাহারও তেমন নাই।’
একই কথা বলছিলেন বাঘার মনিগ্রাম এলাকার আব্দুস সালাম নামের আরেক আমচাষি। তিনি বলছিলেন, ‘ গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। এতেও আমে অতিরিক্ত পোকার আক্রমণ হচ্ছে। আবার গরমেও পোক্ত হওয়া আম ঝরে যাচ্ছে। পাকা আম বাজারে লিয়ে গেলেও তেমন দাম পাওয়া যাচ্চ্যে না। ১০-১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছ্যে। পাকা আমের খরিদ্দার তেমুন থাকে না পরিবহন করা যায় না বলে।’
বানেশ্বর বাজার এলাকার আম ব্যবসায়ী রাজন আলী বলছিলেন। এই সময়ে এতো খারাপ আমের বাজার হবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। এখন দেড় হাজার টাকা মণের নিচে আম হওয়ারই কথা না। কিন্তু সেই আম সর্বনিম্ন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা মণ দরে। বানেশ^র বাজারে প্রতিদিন অন্তত ২০ ট্রাক আম আসছে। কিন্তু বিক্রি করা ক্রেতাদের মুখে তেমন হাসি দেখতে পাচ্ছি না।’
এ বাজারের আম ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশি জাতের আমগুলো প্রায় শেষের দিকে। এখন দেশি জাতের মধ্যে বানেশ^র বাজারে আসছে ফজলি আম বেশি। ৫-৭দিন আগেও এই ফজলি আমও অনেকেই দাম না পেয়ে বাজারেই ফেলে রেখে গেছেন। এখন তাও মণে ১০০ টাকা হারে দাম বেড়েছে। ফজলি বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৮০০ টাকা, লক্ষণভোগ (লখনা) ৬০০-এক হাজার টাকা, আম্রপালি ১৮শ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকা, হাড়িভাঙ্গা দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। আবার যেগুলো একেবারেই বেশি খারাপ সেগুলো ৩০০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে।’
রাজশাহীর ইতিহাস গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘আমের বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৬ জুন থেকে আম্রপালি পোক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আরও ১০ দিন আগ থেকেই রাজশাহীর তীব্র গরম আর রোদের কারণে এ জাতের আমও সময়ের আগেই পাকতে শুরু করেছে। বাজারেও আসছে। গাছ থেকেই আম ঝরে যাচ্ছে। খিরসাপাত, ল্যাংড়া, লখনা, ফজলি আমও এবার ঝরে পড়েছে ব্যাপক হারে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপপরিচালক উম্মে সালমা জানান, এ বছর জেলায় ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এখান থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ২ লাখ ৬০ টন। এবার আমের ফলন ভালো হয়েছে। তবে অন্যান্য বারের তুলনায় দাম কম হওয়ায় চাষিরা কিছুটা হতাশ বলে মনে হচ্ছে।’
স/আর









