রাজশাহীর খবর

রাবিতে নিয়োগ: কর্তৃপক্ষ চাইছে স্বচ্ছতা, আ’লীগ চাইছে দলবাজি

নিউজ ডেস্ক২৫ ডিসেম্বর ২০১৬৬ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ এখন তুঙ্গে। কিন্তু একটি শায়ত্বশাসিত প্রতিষ্টানে নিয়োগ নিয়ে কেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমন বিরোধ এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে-তাই নিয়েই চলছে এখন আলোচনা-সমালোচনা।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইছে নিয়োগ পক্রিয়াটি পুরো স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই হোক। সেইসঙ্গে যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদনকারী বেকাররা পাক নিয়োগ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীরা চাইছেন তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে প্রবেশ করার সুযোগ পাক। তবে এর জন্য তাদের বড় বাধা হলো নিয়োগ বিধিতে বয়সসীমা উল্লেখ করা। এই বয়সসীমা সিথিল না করলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীই তাদের কাঙ্খিত বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির আবেদনেরই সুযোগ পাচ্ছেন না।

 

  • আবার একটি শ্রেণির নেতাকর্মীরা যারা দীর্ঘদিন ধরে পথ চেয়ে বসে আছেন এ নিয়োগ করে কিছু অর্থ কামিয়ে নিবেন, তাদের আশার গুড়ে বালি পড়েছে। ফলে পুরো নিয়োগ প্রকিয়া নিয়েই এখন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে স্থানীয় মতিহার থানা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই বেশি উপকারভোগীর দৌড়ে ছিলেন। কিন্তু তারা বঞ্চিত হচ্ছেন টের পেয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া ভন্ডুল করতে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয় নেন। এরপর শুরু হয় নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধের নামে কথিত আন্দোলন।

 

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শুক্রবার আতঙ্ক সৃষ্টি করে ২৭টি পদে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে এ সমাবেশ হয়।

এ সময় বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে বহিরাগতদের কর্তৃত্ব চলবে না। এরপর এমন ঘটনা ঘটলে তা প্রতিহত করা হবে।
  • এদিকে আজ রবিবার আরো ১৩টি পদে নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। এ পরীক্ষাও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ। তবে গতকাল রাতে মহানগর আওয়ামী লীগের এক বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে তারা। ফলে শিক্ষক নিয়োগের ওই পরীক্ষা কোনো বাধা ছাড়ায় শুরু হয়।  

 

এর আগে সরকারদলীয় লোকজনকে নিয়োগের চাপ সৃষ্টি করতে গত শুক্রবার মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শাখা ছাত্রলীগ পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়। তারা পরীক্ষার্থীসহ শিক্ষকদের নানাভাবে হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে তালা দেয়। বৃহস্পতিবার রাতে উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।তবে বন্ধ করে দেওয়া ওই পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে বা আদৌ হবে কি না তা জানা যায়নি। তবে গত শুক্রবার উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেছিলেন, সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আপাতত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরে আলোচনা করে পরীক্ষার পরবর্তী সময় জানানো হবে।

 

স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগে সরকারি চাকরির বিধি মেনে বয়সসীমা ও লিখিত পরীক্ষা চালু হওয়ায় ক্ষমতাসীনদের পছন্দের প্রার্থীরা বাদ পড়েছেন। প্রার্থীদের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৩০ এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া বেশ কিছু কারিগরি পদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা চাওয়ায় হয়েছে। ফলে যোগ্যতা না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা চাকরির জন্য আবেদনই করতে পারেনি। তাদের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতাও একই পরিস্থিতে পড়েছেন।

 

স্থানীয় আওয়ামী লীগের চাকরিপ্রত্যাশীরা বলছেন, রাজশাহীতে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বরাবরই স্থানীয়দের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ করে চাকরির বয়সসীমা আরোপ হওয়ায় তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

 

  • আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দক্ষ লোক নিয়োগের বিকল্প কিছু দেখছেন না তাঁরা। সে কারণে কম্পিউটার সম্পর্কিত সম্যক দক্ষতার পাশাপাশি বয়সসীমা আরোপ করা হয়েছে। অতীতের প্রশাসনগুলো চল্লিশোর্ধ্ব অনেক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে গেছে। তবে বাস্তবে তাঁরা অপেক্ষাকৃত কম কর্মক্ষমতা দেখাতে পারছেন।

 

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের অবশ্যই বয়সসীমা থাকা দরকার। অবসর নেওয়ার বয়সে কেউ চাকরি পেলে প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় না। কারিগরি দক্ষতা বিবেচনা করে পারদর্শী ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া উচিত।

 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, একটা বয়সসীমা থাকলে ভালো হয়। তাতে দীর্ঘদিন চাকরি করার সুযোগ থাকে। ফলে চাকুরেও তাঁর অর্জিত দক্ষতা দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে সেবা দিতে পারেন।

 

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, ‘চাকরি কে পাবে তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা নেই। তবে অস্বচ্ছতা দূর করে চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা উঠিয়ে দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আমারা অবস্থান নিয়েছি। এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত কোনো বয়সসীমা ছিল না। ’

 

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনসম্পদ নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টেন্ডার-বাণিজ্য রোধে ই-টেন্ডার চালু, ভর্তি পরীক্ষায় স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। সরকারের বিধিমোতাবেক চাকরির বয়সসীমা চালু করা হয়েছে। বয়স্ক কর্ম অক্ষম ব্যক্তিদের দিয়ে কি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব? নিয়োগ-বাণিজ্য বা স্বার্থের জন্য আন্দোলন করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসনের জন্য বর্তমান প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। সুশাসনের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছে তারাই বলতে পারবে কেন তারা বিরোধিতা করছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের আমলে প্রায় ২০০ পদের বিপরীতে ৩৪৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া প্রায় ২০০ পদের বাইরে অতিরিক্ত দেড় শতাধিক শিক্ষক অস্থায়ী ও অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা নেওয়া, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। এর আগেও  বিএনপি-জামায়াত আমলে ৫৪৪ জন কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম হয় বলে অভিযোগ আছে।

 

তবে বর্তমান প্রশাসনের আমলে ৪০-৫০ জনের মতো শিক্ষক নিয়োগ করা হলেও বিজ্ঞাপিত পদের অতিরিক্ত নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় কয়েকটি বিভাগে বিজ্ঞাপিত পদের চেয়েও কম নিয়োগ করা হয়েছে। এ সময়ে শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত চারটি প্রথম শ্রেণির শিক্ষাগত যোগ্যতার বিধান চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে মহানগর আওয়ামী লীগের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

 

আজকের নিয়োগ পরীক্ষাও বন্ধের হুমকি :  আজ সকাল ১০টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ রাসেল মডেল স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদে ৯টি, হিসাব সহকারী (উচ্চমান সহকারী সমমান) পদে একটি, অফিস সহকারী পদে একটি ও সাধারণ কর্মচারীর দুটি পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সময়সূচি নির্ধারিত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবনে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইআর) এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ নিয়োগ পরীক্ষাও বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। গত শুক্রবারের মতো আজও তারা ক্যাম্পাসের ফটক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছে।

 

মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘বয়সসীমা শিথিল, নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোটা চালুর দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যেদিন নিয়োগ পরীক্ষা থাকবে, সেদিনই নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নেবে। আমরা নিয়োগ পরীক্ষা যেকোনো উপায়ে বন্ধ করবই। ’ তিনি আরো বলেন, বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আর দুই মাস সময় আছে। এ সময়ে আর কোনো নিয়োগ পরীক্ষা হতে দেওয়া হবে না।

 

পরীক্ষা বন্ধে আওয়ামী লীগের নেতাদের হুমকির বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আনসার উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের পরীক্ষা গ্রহণের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। তবে যদি কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আর কী করার আছে?’

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মজিবুল হক আজাদ খান বলেন, ‘আমরা পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। তারা যদি সহযোগিতা করে, তবে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে। সহযোগিতা না করলে তো আর কিছু করার নেই। ’

স/আর