রাজশাহী

রাজশাহীতে হুন্ডি-মাদক কারবারে কোটিপতি ধোরা-ছোঁয়ার বাইরে মাফিয়ারা

নিউজ ডেস্ক২৯ জুলাই ২০২৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে অভিযান চালিয়ে দেড় কেজি হেরোইনসহ এক যুবককে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তর। গত ২১ জুলাইয়ের এ ঘটনায় মোঃ ইকবাল হাসান (২৪) নামের এক যুবককেও গ্রেপ্তার করা হয়। সে জেলার পুঠিয়া উপজেলা সদর এলাকার রামজীবনপুর গ্রামের মোঃ সাইদুল ইসলামের ছেলে। ইকবাল হোসেন মূলত দিনমজুর। তার পক্ষে এতো টাকার মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়ার কোনো সুযোগ নাই বলে পরিবারের লোকজন দাবি করেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের একাধিক সূত্রও নিশ্চিত জানায়, ইকবাল টাকার জন্য ওই হেরোইনগুলো কোনো অজানা গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছিল। সে মূলত মাদক বহনকারী। আর সেই হেরোইনগুলোর মালিক অন্য কোনো মাফিয়া। যারা আড়ালে থেকে তৃতীয় পক্ষের মধ্যে ইকবাল হাসানদের মতো দিনমজুরদের কোটি কোটি টাকার এই হেরোইনের চালানগুলো বহন করাচ্ছে। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমানা দিয়ে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক আসছে ভারত থেকে। আর সেই মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত মাফিয়ারা। তারা আড়ালে থেকে এসব মাদকের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছে, আর কদাচিত ধরা পড়ছে দিন মজুররা। ফলে ধোরা-ছোঁয়ার বাইরেই থাকছে মাদকের এ মাফিয়ারা। যারা একেকজন এখন শত শত কোটি টাকার মালিক বনেও গেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র মতে, রাজশাহীতে মাদক আর হুন্ডি ব্যবসা করেই অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের ভারে অন্তত ৫০০ ব্যক্তি হয়েছেন কোটিপতি। গাড়ি-বাড়ি, মার্কেট, শো-রুম থেকে শুরু করে অগাধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন কেউ কেউ। বছরের পর বছর ধরে তারা আড়ালে থেকে মাদক আর হুন্ডির নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। কিন্তু প্রশাসনের কাছে এরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। তবে এর মধ্যে কেউ যে ধরা পড়েনি তাও নয়। অন্তত ১০-১২ জন শীর্ষ মাদক ও হুন্ডি কারবারি ধরা পড়েছেন। তালিকায় নাম এসেছে আরও অন্তত দুইশ জনের। কিন্তু প্রমাণ না থাকায় বাকিদের ধরতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত ১৩ জুন রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেছিলেন, “গত ২০ বছরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুধু মাদক ব্যবসা করেই এক হাজার ব্যক্তি কোটিপতি বনে গেছেন। অবিলম্বে এসব মাদক কারবারিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

ওইদিন তিনি আরও বলেন, ‘‘মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং মাদক কারবারিদের তালিকা করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’’

তার এ বক্তব্যের পরে নড়েচড়েও বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে অন্তত ৫ কোটি টাকার মাদক জব্দ করেছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু মূল মাফিয়ারা এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি এই কয়দিনে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের তালিকায় পাওয়া রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাদক এবং হুন্ডি মাফিয়াদের মধ্যে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহীর শীষ মোহাম্মদ, আতিকুর রহমান কালু, রুলু, সদর আলী, মখলেছুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, আলতাফ হোসেন, সদর আলী, আনোয়ারুল হক, সোহেল রানা, বেলাল উদ্দিন, আব্দুস সাত্তার, দুলাল হক, হাবিব, হাসিনা খাতুন, আবুল কালাম আজাদ, ফটিক, আজিজুল ইসলাম, মিজানুর রহমান মিজান, সাহাবুল, মোক্তার হোসন ওরফে মুক্তা, নওসাদ আলী, জিয়ারুল হক, তারেক হোসেন, আব্দুল্লাহ, আশরাফ আলী, আলমগীর হোসেন টিটু, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শহিদ রানাআব্দুর রাজ্জাক, শামসুল হক, কালু ওরফে মাহাবুব আলম, ইসারুল ইসলাম, মাসুদ রানা, নুরুল ইসলাম, টিপু প্রমুখ।

এদের মধ্যে কেউ কেউ শত কোটি টাকার মালিক। কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছেন। আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে মাদক ও হুন্ডি কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ পলাতক অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ করছেন এ সিন্ডিকেট। আর কেউ বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করছেন হুন্ডি ও মাদকের চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ। রাজশাহীর সিটি হাট ঘিরে রয়েছে বড় একটি হুন্ডি চক্র। এই হাটের নিয়ন্ত্রকারী কয়েকজন ব্যবসায়ীও হাট ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য উঠে এসেছে। এদের কয়েকজনের নামে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগে মামলাও হয়েছে। কেউ আবার হুন্ডি ব্যবসায়ী হিসেবে জেলেও খেটেছেন। তবুও এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি তারা।

এদিকে, রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তর সূত্র মতে, সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে গোদাগাড়ীর শীর্ষ দুই মাদক কারবারির সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। আরও ২০ জনের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। পর্যায়ক্রমে গোদাগাড়ীর ১৮৪ জন হেরোইন মাফিয়ার ব্যাপারে তদন্ত করা হবে।

এ অবস্থায় গোদাগাড়ীর শীর্ষ মাদক কারবারিরা তাদের অবৈধ সম্পদ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারাগারে থাকা গোদাগাড়ীর সবচেয়ে বড় মাদক কারবারি তারেক হোসেনের সম্পদ ক্রোক করা হয় সম্প্রতি। এরপর বিষয়টি জানাজানি হয়।

সূত্র মতে, রাজশাহীর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত গত ৬ এপ্রিল মো. আব্দুল্লাহ নামের এক মাদক ব্যবসায়ী ও তার স্ত্রী সায়েরা বেগমের সম্পদ ক্রোক করার আদেশ দেন। আদেশে ছয়টি দলিলে থাকা আব্দুল্লাহর ১৯৯ দশমিক ২১ শতাংশ এবং সায়েরার পাঁচটি দলিলে থাকা ১৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ জমি ক্রোক করা হয়। এছাড়া ২৩ মে একই আদালত শীর্ষ মাদক কারবারি তারেক হোসেনের চারটি দলিলে থাকা ১৯৯ দশমিক ১১৭৫ সহস্রাংশ জমি ক্রোক করার আদেশ দেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘অনেকেই মাদক ব্যবসা করেই কোটিপতি হয়েছেন। তবে মাদক ব্যবসায়ীদের মাদকের প্রতি নিরুৎসাহিত করতে আমরা তাদের সম্পদ ক্রোক করার ব্যবস্থা করছি। ইতোমধ্যে দু’জনের সম্পদ ক্রোক হয়েছে। আমরা এখন আরও ২০ জনের ব্যাপারে তদন্ত করছি। তাদের সম্পদ খুঁজে দেখতে আমাদের ২০-২২টি দপ্তরের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। যারা তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী, আয়ের বৈধ উৎস নেই; কিন্তু সম্পদ আছে- এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করা হবে।’

তিনি জানান, তাদের কার্যালয়ে গোদাগাড়ীর শীর্ষ ১৮৪ জন মাদক কারবারির তালিকা আছে। এরা বড় হেরোইন কারবারি হিসেবেই পরিচিত। তারাই হেরোইন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। বাকিরা তাদের হয়ে কাজ করে। একে একে এদের সবাইকেই তদন্তের আওতায় আনা হবে।