নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বিদিরপুর হাটে কৃষক যে পটোল বিক্রি করছেন মাত্র ১৩ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে, সেই একই পটল মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী শহরে পৌঁছেই বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি। এতোটুকু দূরত্বের পথ অতিক্রম করতেই পটলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। প্রশ্ন উঠেছে, এই অতিরিক্ত অর্থ যাচ্ছে কার পকেটে?
গত বুধবার মোহনপুর উপজেলার বিদিরপুর হাট ঘুরে দেখা যায়, সেখানে প্রতি মণ (৪৫ কেজি) পটোল বিক্রি হয়েছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। সেই হিসাবে প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ টাকা। কিন্তু রাজশাহী শহরে এসে সেটি ওইদিনই হয়ে যায় ২৫-৩০ টাকা। গতকাল শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ৩০-৩৫ টাকা। এর মধ্যে মাঝে দুদিনে মণে ১-২ টাকা দাম বেড়েছে যদিও।

বিদিরপুর বাজারে পটল বিক্রি করতে আসা কৃষক জুলহাস উদ্দিন বলেন, সার-বিষের দাম বকড়তি। ফলে পটল চাষের খরচ বেড়ে গেছে। তাতে এই দামে পটোল বিক্রি করে খুব বেশি লাভ থাকছে না। কিন্তু পটল পুষ্ট (পোক্ত) হয়ে গেলে তো জমিতে রাখা যায় না। পচে যায়। তাই দাম যায় হোক বিক্রি করতেই হবে। কয়দিন আগে দুইশ-তিনশ টাকা মণও বিক্রি করেছি বাধ্য হয়ে। এখন তাও দাম বেড়েছে বৃষ্টির কারণে।”
তিনি জানান, সবজি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা হাটেই বিক্রি করে দেন।
অন্যদিকে রাজশাহী শহরের বিভিন্ন কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, একই মানের পটোল গতকাল শুক্রবার বিক্রি হয় ৩০-থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে। বিদিরপুর হাট থেকে শহরের দূরত্ব মাত্র ১৫ কিলোমিটার হলেও এই স্বল্প পথ পেরোতেই দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
বিদিরপুর হাটটি রাজশাহী অঞ্চলের অন্যতম বড় সবজির বাজার। সপ্তাহে দুই দিন বসা এই হাটে শত শত মণ পটল বিক্রি হয়। এখান থেকে রাজশাহী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় পটল সরবরাহ করা হয়।
এদিকে গতকাল শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বৃহৎ তাহেরপুর হাটেও প্রতি মণ (৪৫ কেজি) পটোল বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অর্থাৎ কৃষক সেখানে পেয়েছেন প্রতি কেজিতে ১৭ থেকে ২০ টাকা। কিন্তু গতকাল ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সেই একই পটল বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
তাহেরপুর হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী কাজেম আলী বলেন, রাজশাহী থেকে ঢাকায় পটল পরিবহনে উল্লেখযোগ্য খরচ হয়। একটি ট্রাক পটোল ঢাকায় পৌঁছাতে গাড়িভাড়া, কুলি, লোড-আনলোড, টোলসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এসব ব্যয় বহনের পর কোনো চালানে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ হয়, আবার কখনো লোকসানও গুনতে হয়। তবে মাঝখানে আড়তদার এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা কখনো লোকসান গুনেন না। লোকসান হয় কৃষকের অথবা পাইকারদের।”
মনিরুল ইসলাম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আড়তদাররা সাধারণত বিক্রির ওপর ১ থেকে ২ শতাংশ কমিশন নেন। অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা কেনামূল্য যাই হোক না কেন, প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লাভ রাখেন। ফলে প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছে গিয়ে ২০ টাকার পটল হচ্ছে ৫০ টাকা।
তাহেরপুর বাজারে পটোল বিক্রি করতে আসা কৃষক সোলেমান হোসেনের অভিযোগ, উৎপাদনের ঝুঁকি ও পরিশ্রম তাদের হলেও মূল্য বৃদ্ধির সবচেয়ে কম সুবিধা পান তারাই। অন্যদিকে ক্রেরাও বেশি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে কৃষক বঞ্চিত, অন্যদিকে ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স.আর









