রাজশাহী

১০ কোটি টাকার সরাঞ্জমসহ ধংস সাইবার ক্রাইম ফরেনসিক ল্যাব, অপরাধ তদন্তে ধীরগতি

নিউজ ডেস্ক৪ মে ২০২৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :

রাজশাহী মহানহর পুলিশের (আরএমপি) সাইবার ক্রাইম (অপরাধ) ইউনিটের একটি ফরেনসিক ল্যাব ছিল ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের আগে। এই ল্যাবে তিনটি পেনড্রাইভে এমন সব সফটওয়ার ছিল যাতে মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া সাইবার অপরাধগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা যেত।

আমেরিকার দেওয়া এই পেনড্রাইভগুলোর একেকটির দাম ছিল কোটি টাকার ওপরে। মূলত সাইবার অপরাধ তদন্তেই এই পেনড্রাইভগুলো ব্যবহার করা হতো। যা অন্য যে কোনো কম্পিউটার বা ল্যাপটপে সাপোর্ট করে না। এছাড়াও একেকটি অন্তত ৫-৬ লাখ টাকা মূল্যের ১২০টি ল্যাপটপ ছিল। প্রায় ১০ কোটি টাকা মুল্যের এসব সরাঞ্জমাদি সাইবার অপরাধ তদন্তে ব্যবহৃত হত। আরএমপি সূত্র মতে, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ লক (পাওসয়ার্ড দিয়ে বন্ধ রাখা) রাখা হলেও ওই সফটওয়ার দিয়ে সেগুলো খুলে সেখান থেকে অপরাধের তথ্য বেরকরা যেত। পাশাপাশি আর কারা জড়িত থাকতে পারে ওই অপরাধীর সঙ্গে, সেটিও বের করা যেত এক থেকে সাত দিনের মধ্যে।

কিন্তু এখন সেসব তথ্য পেতে ঢাকার সাইবার ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে হচ্ছে আলামত। অথচ একসময় রাজশাহী মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরেই এই কাজটি হতো।
আরএমপির সাইবার অপরাধ ইউনিট সূত্র মতে, ৫ আগস্টে রাজশাহী মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ফলে পুরো ল্যাবটিই ধংস করে দেয় আন্দোলকারীরা। আর তার পর থেকে রাজশাহীতে সাইবার অপরাধ তদন্তে নেমে এসেছে অনেকটা ধীরগতি। শুধু রাজশাহী নয়, বিভাগের
আটটি জেলা থেকেই আরএমপি সদর দপ্তরে পাঠানো হয় সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত ঘটনাগুলো।

বিশেষ করে আসামি চিহ্নিতকরণ, তার অবস্থান নির্নয় করতে এবং আলামত উদ্ধার করতে কাজ করে এই সাইবার অপরাধ ইউনিট। এই ইউনিট তথ্য পাওয়ার পরে সেগুলো সংশ্লিষ্ট থানা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে।

আর সেই তথ্য নিয়ে অপরাধীর বিষয়ে কাজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখনো এই ইউনিটটি সক্রিয় আছে। তবে আগুনে ধংস হয়ে যাওয়া এবং লুট হওয়ার পরে সাইবার অপরাধ তদন্তে অনেকটায় বেগ পেতে হচ্ছে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের।

আরএমপি সূত্র মতে, ‘আমরিকান সরকারের অর্থায়নে সাইবার অপরাধ তদন্তে আরএমপি সদর দপ্তরে গড়ে তোলা ওই ল্যাবটি পুরোপুরি ধংস করা হয় ৫ আগস্ট। এর পরে অর্থাভাবে আর সেটি গড়ে তোলা যায়নি। তবে এখনো সাইবার অপরাধ দমনে ওই ইউনিটে ১২জন সদস্য কাজ করছেন। সে ক্ষেত্রে অতিত অভিজ্ঞতা আর কিছু সরাঞ্জমাদির মাধ্যমে সাইবার অপরাধীদের নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদের।

তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে এখন নির্ভর করতে হচ্ছে আসামির স্বীকারোক্তি বা ঢাকার ল্যাবে পাঠানোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। অথচ এই কাজগুলো একসময় রাজশাহীর ল্যাবেই করতে পারত সাইবার ইউনিটটি। আরএমপি সূত্র মতে, এখনো গড়ে অন্তত ১০০টি অভিযোগ আসছে সাইবার সংক্রান্ত। রাজশাহীসহ বিভাগের আট জেলায় সাইবার অপরাধের শিকার ভূক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট থানায় যে সাধারণ ডায়েরিগুলো করেন, সেগুলোই পাঠানো হয় আরএমপির সদর দপ্তরের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে। ফেসবুক, অনলাইন, ইউটিউব, টুইটার, ইন্সট্রাগ্রাম, হোয়াটস্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে
সংঘটিত অন্তত ১০০টি অভিযোগ আসে প্রতি মাসে। এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মূলত থাকে অপিরিচিত। তাদের চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার
করে সেগুলো আবার দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট থানা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এর পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে আগে আরএমপির যে ল্যাব ছিল, সেটি পুরোটায় ধংস হওয়ার কারণে এই অপরাধ তদন্ত করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের। হচ্ছে সময়ক্ষেপনও।

সাইবার ইউনিটে কর্মরত একজন পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
‘অপরাধীরা সাধারণত মোবাইল, ল্যাপটপট বা কম্পিউটার পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করে রাখে। আমাদের সাইবার ইউনিটে যখন ফরেনসিক ল্যাব ছিল, তখন সফটওয়ারের মাধ্যমে আমরা সেই পাসওয়ার্ডগুলো ধংস করেই মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার থেকে অপরাধীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এমনকি আর কারা জড়িত সেগুলো বের করতেক পারতাম।

কিন্তু এখন আর সম্ভব হয় না। লক করা থাকলে অপরাধীর স্বীকারোক্তি বা তার
নিকট থেকে পাসওয়ার্ড নিয়ে তথ্য বের করতে হয়। এটি তদন্তকাজে বড় ধরনের সমস্যা তৈরী হয়।র্’ সূত্র মতে, সম্প্রতি রাজশাহীর পবা এলাকার এক শিক্ষার্থীর নিকট ফেসবুক হ্যাক করে অশ্লিল ছবি ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করে প্রতারক চক্র।

এ ঘটনায় ওই শিক্ষার্র্থী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরবর্তিতে আরএমপির সাইবার ইউনিট ঘটনাটি তদন্ত করে অভিযুক্তকে খুঁজে বের করেন। কিন্তু এর সঙ্গে আর কারা জড়িত সেটি আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বের করে পুলিশ। তবে এর আগে এই ধরনের ঘটনার সকল অপরাধীদের তথ্য বের করা যেত আরএমপির ফরেনসিক
ল্যাব থেকেই। এমনকি আসামির মোবাইল ট্র্যাকিং করে গতিবিধি পর্যবেক্ষণও করা হতো এখান থেকেই। তবে এটিও এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধান গাজিউর রহমান বলেন, ‘আােগ আমাদের একটি সমৃদ্ধ ল্যাব ছিল।

এখন সেটি আর নাই।
কিছু প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা এখনো সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করছি। তবে আগের যে উন্নত প্রযুক্তিগুলো ছিল, সেগুলো এখন আর নাই। এতে করে তদন্ত করতে গিয়ে কখনো কখনো দেরিও হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনেক সময় আলামত পাঠাতে হচ্ছে ঢাকায়। সেখান থেকে ফরেনসিক প্রতিবেদন আসতে এক থেকে তিন মাস বার তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এতে করে তদন্তকাজ কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সূত্র মতে, গত বছরও আরএমপির সাইবার ইউনিটে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ অনালাইন মাধ্যমে করা অপরাধের সাড়ে সাতশ অভিযোগ আসে
তদন্তের জন্য। এর বাইরে আরও প্রায় ৮০০ অভিযোগ আসে বিকাশ, নগদ হ্যাকের। এগুলোর মধ্যে বেশকিছু নিস্পত্তি করে প্রতিবেদন দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। কিন্তু এখনো পড়ে আছে অনেকগুলো অভিযোগ। এর অন্যতম কারণ হলো সাইবার ফরেনসিক ল্যাব না থাকা।