রাজশাহী

জনবল খরায় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলায় আইসিইউ সেবা অচল রোগীর তীব্র চাপ পড়ছে রামেক -শিশুর মৃত্যু ৩

নিউজ ডেস্ক৫ এপ্রিল ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজশাহী বিভাগের পাঁচ জেলার হাসপাতালগুলোয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও শয্যা থাকার পরও জনবল সংকটে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) কার্যত: অচল হয়ে আছে। দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকার অভাবে বিভাগের রাজশাহী, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ও নওগাঁয় জেলায় কমপক্ষে ৬০টি আইসিইউ শয্যা পড়ে আছে। হাসপাতালগুলোর আইসিইউ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন থাকায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতিও।

আইসিইউ সেবা বন্ধ থাকায় জেলা শহর থেকে রোগী পাঠানো হচ্ছে বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে। কিন্তু এখানেও রোগীর চেয়ে আইসিইউ শয্যা কম থাকায় প্রতিদিন অপেক্ষমান থাকতে হচ্ছে গড়ে ৪০ জন রোগীকে। অপেক্ষমান রোগীদের একটি অংশ মারা যাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিইউ পরিচালনার জন্য অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকার দরকার হয়।

কিন্তু এসব জনবলের ঘাটতির কারণে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিশুদের হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে গুরুতর রোগীদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এই হাসপাতালেও মাত্র ৪৩ শয্যা রয়েছে।

কম জনবল দিয়ে আইসিইউ সেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রামেকে ৪৩ শয্যার একটি আইসিইউ ইউনিট রয়েছে- এখনো সরকারিভাবে এটি অনুমোদিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী এখানে অন্তত ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র একজন। প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে কোনোভাবে আইসিইউ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ জন রোগী আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। সূত্র মতে,, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৪০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও এটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। নেই জনবলও।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে আইসিইউটি। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৮টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও জনবল সংকটে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারি টিএমএসএস হাসপাতালেও ১৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র ৪টি সচল রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৬টি ও শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। আছে আধুনিক যন্ত্রপাতিও। তবে ২০১৪ সাল থেকেই এ দুই হাসপাতালে জনবল সংকটে সেগুলো অচল রয়েছে। এছাড়াও জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ২০২২ সালে ১০টি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত করা হলেও এখনো চালু করা যায়নি।

পাবনা জেলা হাসপাতালে চার শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু জনবল এবং দক্ষ টেকনিশিয়ানের কারণে সেটিও বন্ধ রয়েছে। এই হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরেই আইসিইউ অচল পড়ে আছে। মুমূর্ষু রোগীদের পাঠাতে হচ্ছে রাজশাহীতে। অনেক দূরের পথ হওয়ায় রাস্তায় কোনো কোনো রোগী মারা যাচ্ছেন। নওগাঁ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুজার গাফফার কালের কণ্ঠকে বলেন, “কিছুদিন আগে সাত শয্যার আইসিইউ ইউনিট এখানে চালু করার জন্য জায়গা বরাদ্দ রাখা হয়। সেখানে শুধু ওয়াল তুলে রাখা হয়েছে কিন্তু যন্ত্রপাতি বা জনবল এখনো নিয়োগ করা হয়নি যার কারণে আইসিইউ চালু করা যায়নি।
রাজশাহী হাসপাতালের চিকিৎসকরা অভিযোগ করে বলেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় রোগীদের দ্রুত রাজশাহীতে নিতে গিয়ে অনেক সময় জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের জন্য এই স্থানান্তর অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

রাজশাহী হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পিকে এম মাসুদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী হাসপাতালে আশেপাশের জেলাগুলো থেকে অনেক রোগী আসে। অনেক সময় একেবারেই শেষ পর্যায়ে রাজশাহী হাসপাতালে পৌঁছায়। তখন তাদের আইসিইউ প্রয়োজন হয় কিন্তু এখানে আইসিইউ শয্যা যথেষ্ট না থাকায় তাদেরও তাৎক্ষণিক ভর্তি করা সম্ভব হয় না।

এ বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, আইসিইউ চালু রাখতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সের প্রয়োজন হয়, কিন্তু বর্তমানে এসব পদে নিয়োগ নেই। তবে ভবিষ্যতে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

রামেক হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু: রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ হাসপাতালে হাম সন্দেহে মারা গেছে ৩৮ জন শিশু। এছাড়াও হাসপাতালে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, গত শুক্রবার দুপুর থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।