আন্তর্জাতিক

৭০ বছর পর ঢাকা-আসাম বাণিজ্যিক নৌ-পথ চালু ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি নজর থাকবে আরো যেসব বিষয়ে

নিউজ ডেস্ক১৫ অক্টোবর ২০২৬৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দেশভাগের ৭০ বছর পর চালু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-আসাম বাণিজ্যিক নৌ-পথটি। ১৯৫৬ সালের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া এই বাণিজ্যিক নৌ-পথটি গত ৫ অক্টোবর চালুর মাধ্যমে দুই দেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।

তবে এই বাণিজ্যিক নৌপথটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধু ঐতিহাসিক গুরুত্বের ওপর নির্ভর করবে না। এর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত টেকসই স্থায়িত্ব নিশ্চিতের পাশাপশি এই পথে পণ্য পৌঁছতে কত সময় লাগে, খালাসের প্রক্রিয়া কতটা মসৃণ হয় এবং পরবর্তী চালান কত দ্রুত শুরু হয়।
সেই সাথে ব্যবসায়ীরা এই রুটটি তখনই ব্যবহার করবেন যখন এটি সড়ক বা রেলপথের চেয়ে সাশ্রয়ী ও সময়োপযোগী হবে। প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথে পণ্য পরিবহনের ট্রানজিট চার্জ এবং জ্বালানি খরচ কতটা প্রতিযোগিতামূলক থাকছে, তার ওপর এই রুটের বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ভর করছে।

 

ব্রহ্মপুত্র নদের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি কার্গো জাহাজ (বার্জ) বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। আসাম সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড’ (এপিসিএল)-এর নামরুপ কারখানায় এই মিথানল তৈরি।

আসাম কি নতুন বাজারে পৌঁছাতে পারবে?

এপিসিএল-এর এই মিথানল চালানটি মূলত নদীপথের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রথম পরীক্ষা। পণ্যের পরিমাণ, হ্যান্ডলিং সুবিধা এবং চাহিদা থাকলে ভবিষ্যতে পেট্রোলিয়াম, কয়লা, চা এবং কিছু কৃষিপণ্যও এই পথে পাঠানোর কথা ভাবা যেতে পারে।

তবে এগুলো কেবলই সম্ভাবনা, এখনো নিশ্চিত কোনো রপ্তানি পরিকল্পনা নয়। বগিবিল টার্মিনালের পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা নিয়ে করা রিপোর্টে ভবিষ্যতে এই ধরণের পণ্য পাঠানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

ইন্ডিয়ারন ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পণ্যের ধরনের ওপর ভিত্তি করে পরিবহনের খরচ আলাদা হবে। বড় বড় শিল্প পণ্যের চালানের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণের কারণে হ্যান্ডলিং খরচ পুষিয়ে নেওয়া যায়; তবে ছোট বা পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে বারবার লোড-আনলোড এবং গুদামজাতকরণের কারণে এই পথটি হয়তো খুব একটা সুবিধাজনক নাও হতে পারে। এছাড়া উৎপাদনকারীদের অবশ্যই ক্রেতাদের দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে হবে।

সড়ক ও রেলপথের বদলে নদীপথ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সরকারের ‘জলবাহক’ প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যা পুরো লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে সচল করার প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে।
যদি এই রুটটি কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে নিয়মিত জাহাজ চলাচল দেখে লজিস্টিকস কম্পানিগুলো বগিবিলকে কেন্দ্র করে তাদের সেবা বাড়াতে উৎসাহিত হবে। এতে অন্যান্য উৎপাদকরাও ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর একটি নতুন বিকল্প পথ পাবে। তবে এটি তখনই সম্ভব হবে যখন ব্যবসায়ীরা বাস্তবে এই রুটটি ব্যবহার করবেন, কেবল একটি টার্মিনাল থাকলেই তা হবে না। ‘ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ (আইডব্লিএআই)-এর জাতীয় জলপথ-২ প্রোফাইলে বগিবিলকে একটি বৃহত্তর মালবাহী নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পণ্য পরিবহনের অর্থনৈতিক হিসাব

খন্দকার রাসেল হাসান, এম জিয়াউদ্দিন আলমগীর এবং এম শাহেদুল ইসলামের যৌথ গবেষণা, ‘ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবস্থার সম্ভাবনা’-তে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কেন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নদীপথ এখনো এত কম ব্যবহৃত হয়। গবেষকরা এর পেছনে অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ঘাটতি, দীর্ঘ সময় লাগা, কম সার্ভিস প্রোভাইডার, নদীর পানির গভীরতার ওঠানামা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। একটি রুট ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য সেটি সবচেয়ে সহজ বা সাশ্রয়ী নাও হতে পারে।

 

দীর্ঘ দূরত্বে ভারী পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথ উপযুক্ত হতে পারে, তবে নদীর ভাড়াই কিন্তু শেষ কথা নয়। পণ্য টার্মিনালে আনা, লোড করা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং সেখান থেকে আবার অন্য পরিবহনে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার খরচও এর সাথে যুক্ত হয়। যেকোনো দেরি বা অনিয়মিত জাহাজ চলাচল নদীপথের সাশ্রয়কে নষ্ট করে দিতে পারে। হাসান, আলমগীর এবং ইসলামের গবেষণায় দীর্ঘ সময় লাগা এবং অনিয়মিত সেবাকেই এই পথ জনপ্রিয় না হওয়ার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারের ‘জলবাহক’ প্রকল্পের আওতায়, ২০০ কিলোমিটারের বেশি নদীপথের যাত্রায় যোগ্য পণ্য মালিকদের প্রকৃত পরিচালন ব্যয়ের ওপর ৩৫শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে (তবে পণ্য আনা-নেওয়ার প্রথম ও শেষ মাইলের খরচ এর বাইরে থাকবে)। এই প্রকল্প চালুর মাধ্যমেই সরকার স্বীকার করে নিয়েছে—সড়ক ও রেলপথের প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক থেকে পণ্য নদীপথে সরাতে কেবল অবকাঠামো থাকলেই চলে না, বাড়তি সুবিধারও প্রয়োজন হয়। সামনের চালানগুলোই বলে দেবে এই প্রণোদনা ডিব্রুগড় রুটকে বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করতে পারছে কি না।

ব্রহ্মপুত্র নদের কিছু কঠিন সীমাবদ্ধতা

নদীটির নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইডব্লিএআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে নেয়ামতি পর্যন্ত নদীর নাব্য বা গভীরতা বজায় রাখা হয় ২.৫ মিটার, নেয়ামতি থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত ২ মিটার এবং ডিব্রুগড় থেকে সাদিয়া পর্যন্ত মাত্র ১.৫ মিটার। এই সীমাবদ্ধতা জাহাজের আকার, পণ্যের ওজন এবং সময়সূচীকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নদীর তলদেশের পরিবর্তনশীল চ্যানেল এবং মৌসুমী আবহাওয়ার কারণে এখানে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রেজিং এবং নৌ-সহায়তার প্রয়োজন হয়।

টার্মিনাল তৈরির পাশাপাশি এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একটি টার্মিনালে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ব্যবস্থা হয়তো আছে, কিন্তু নদীপথের কারণে জাহাজগুলো সারা বছর একই ওজনের পণ্য নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে চলাচল করতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

একটিমাত্র যাত্রা কখনোই বাণিজ্য করিডোর নয়

বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো এই একটি মাত্র চালানকে একটি নিয়মিত সেবায় রূপান্তর করা। এপিসিএল যদি সামনে আরও মিথানল পাঠাতে পারে, তবেই বোঝা যাবে তারা এই প্রক্রিয়া সফলভাবে ধরে রাখতে পেরেছে; আর অন্যান্য কোম্পানি পণ্য পাঠালে বোঝা যাবে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সবসময় মোট খরচ, কাস্টমসের বিলম্ব, জাহাজ ছাড়ার ফ্রিকোয়েন্সি এবং ফেরার পথে জাহাজটি খালি না এসে অন্য কোনো পণ্য আনতে পারবে কি না—এই বিষয়গুলো হিসাব করবেন। ভারত-বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ বাণিজ্য নিয়ে করা গবেষণাতেও এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

এই রুটের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সহযোগিতার ওপরও অনেকখানি নির্ভরশীল। এই যাত্রার জন্য বাংলাদেশের জলপথ, বন্দর এবং কাস্টমস ব্যবস্থার নিয়মিত ও সহজ সহযোগিতা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ভারত যেমন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের একটি বিকল্প পথ পাচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশও বন্দর ব্যবহার ও ট্রানজিট সেবার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। দ্বিপাক্ষিক প্রটোকলটি কেবল একটি আইনি কাঠামো দেয়, তবে এর আসল মূল্য নির্ভর করবে প্রতিদিনের পারস্পরিক সমন্বয়ের ওপর।

 

ডিব্রুগড়ের এই চালানটি ব্রহ্মপুত্র নদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে একটি বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এর আসল গুরুত্ব বোঝা যাবে নিয়মিত যাতায়াত, সাশ্রয়ী খরচ এবং সময়মতো পণ্য পৌঁছানোর ওপর। এই যাত্রা প্রমাণ করেছে যে উচ্চ আসামের পণ্য নদীপথে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে পারে; তবে ব্যবসায়ীরা এই পথে বারবার ফিরে আসবেন কি না—তার ওপরই নির্ভর করছে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে প্রতিবেশীদের যোগাযোগের ভবিষ্যৎ। প্রথম চালানের সরকারি বিবরণীতেও এটিকে নদীর পণ্যবাহী সম্ভাবনার একটি পরীক্ষা হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।