নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর শিমলা পার্কের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার মর্যাদা কার্যকর করা, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং জলাভূমি রক্ষার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও যুব সংগঠনের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, জলাভূমি ভরাট, পুকুর ও বিল দখল, গাছ কাটা, নদীদূষণ ও পাখি শিকারের কারণে পাখির বিচরণক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন।
বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেল চারটায় রাজশাহীর শিমলা পার্কে আয়োজিত এক পথসভা থেকে এসব দাবি জানানো হয়। বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস), বারসিক, গ্রিন কোয়ালিশন এবং সেভ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড নেচারের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘প্রতিটি পাখিই গুরুত্বপূর্ণ—আপনার পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ’।

পথসভায় বক্তারা বলেন, পরিযায়ী পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, পরাগায়ন ও বীজ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণ জলাভূমি, প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, পাখি সংরক্ষণ শুধু পাখি রক্ষার বিষয় নয়; এটি পুকুর, নদী, জলাশয়, জলাভূমি, গাছপালা ও সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে যুক্ত। শিমলা পার্কের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার মর্যাদা কার্যকর করে পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে।
সেভ দি নেচার অ্যান্ড লাইফের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের পুকুর, বিল, নদী, জলাভূমি ও বৃক্ষভিত্তিক আবাসস্থল পাখির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ দখল ও দূষণমুক্ত রাখার পাশাপাশি সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সেভ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড নেচারের সভাপতি ইমরুল কায়েস বলেন, পাখি পর্যবেক্ষণ, প্রজাতি শনাক্তকরণ ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তরুণেরা সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। ‘পাখি দেখুন, তথ্য রাখুন, আবাসস্থল বাঁচান’—এ চর্চা ছড়িয়ে দিতে যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
গ্রিন কোয়ালিশনের সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জুয়েল কিবরিয়া বলেন, প্রতিটি পাখিই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে পাখি শিকার ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনা বন্ধ করতে হবে। সবার জন্য বাসযোগ্য ও পাখিবান্ধব শহর হিসেবে রাজশাহীকে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
কর্মসূচি থেকে আট দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পুকুর, বিল, জলাভূমি, নদী, পদ্মার তীর ও চরাঞ্চলকে পাখির আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করা; রাজশাহী নগরের পুকুর, জলাশয়, উদ্যান ও সবুজ এলাকাকে নগর প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের আওতায় আনা; শিমলা পার্কের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার ঘোষণা কার্যকর করে সীমানা নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, নিয়মিত নজরদারি ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।মানচিত্র দেখুন
এ ছাড়া শিমলা পার্কসহ সংরক্ষিত এলাকাগুলো দখল ও দূষণমুক্ত রাখা, শব্দবর্ধক যন্ত্রের ব্যবহার ও অতিরিক্ত আলোর কারণে পাখির আবাসস্থলে সৃষ্ট বিরূপ প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, পাখি শিকার ও বন্যপ্রাণী হয়রানি বন্ধ এবং বর্জ্য ফেলা ও আবাসস্থল ধ্বংসের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পাখির আবাসস্থল নিয়ে স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্য ও পাখির মানচিত্র তৈরি এবং যুবক, শিক্ষার্থী, পাখি পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে পাখি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান তাঁরা।
দাবিগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে, পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণকে নগর পরিকল্পনা, জলাভূমি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা; রাজশাহীতে বৃক্ষ নিধন বন্ধ করা এবং শহরের অবশিষ্ট গাছগুলোকে পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। পাখি ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবাদী যুবসমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, দেশে পরিবেশ সংরক্ষণে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। পুকুর ভরাট, গাছ কাটা, পাখি শিকার ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ হত্যা অপরাধ হলে গাছ, পুকুর, পাখি ও পরিবেশ ধ্বংসের জন্যও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।অনলাইন কোর্স খুঁজুন
কর্মসূচিতে সামাজিক কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হান, আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিদ কুমার ওরাও, আদিবাসী যুবনেতা উপেন রবিদাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানীসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকেরা বলেন, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও যুবসমাজের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাঁরা শহর, সমাজ ও দেশকে পাখিবান্ধব এবং প্রাণ-প্রকৃতিবান্ধব করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।









